প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ভয়াবহ সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় আজ ঘোষণা হতে যাচ্ছে। শুধু একটি মামলার রায় নয়, আজকের দিনটিকে ঘিরে অপেক্ষায় রয়েছে পুরো বাংলাদেশ এবং বৈশ্বিক মানবাধিকার অঙ্গন। স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সরকারপ্রধানকে গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তাই রায়ের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে গেছে।
আজ সকাল ১১টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ আদালতে বসবেন। তার সঙ্গে রয়েছেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। দীর্ঘ তদন্ত, অসংখ্য নথি, ছবি, ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ মিলিয়ে যে মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে, আজ তা শেষ পর্বে পৌঁছাচ্ছে।
এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় গত মে মাসে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর। ১২ মে তদন্ত সংস্থা প্রায় সাড়ে আট হাজার পৃষ্ঠার বিশদ প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেয়। রিপোর্টে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন চলাকালে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহারের প্রামাণ্য বিবরণ উঠে আসে। ১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দাখিল করা হয় এবং ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করার নির্দেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগ গঠনের দিন পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন, যা আদালত মঞ্জুর করে। এর মধ্য দিয়ে মামলার প্রমাণের কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়।
মোট ২৮ কার্যদিবসে ৫৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি আদালতে শোনা হয়। প্রথম সাক্ষী হিসেবে হাজির হন যাত্রাবাড়ীর খোকন চন্দ্র বর্মণ, যিনি জুলাই-আগস্টে পুলিশের গুলিতে আহত হন এবং নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর নেমে আসা নির্মমতার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। খোকনের চোখে সেই দিনের আতঙ্ক আর অসহায়তার যে প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে, তা আদালতকক্ষের সবার মনকে নাড়া দেয়। একইভাবে বুদ্ধিজীবী মরহুম বদরুদ্দীন উমর লিখিত সাক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। এছাড়া সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেন, যেখানে তারা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা, রাজনৈতিক নির্দেশনা এবং মাঠপর্যায়ের সহিংসতার বিস্তারিত বর্ণনা করেন। ৮ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীরের জেরা শেষ হওয়ার পর সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব সমাপ্ত হয়।
২৩ অক্টোবর যুক্তিতর্কের শেষ দিনে অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত হেভিওয়েট নেতাদের উদাহরণ টেনে দেখান, কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার গণহত্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং কীভাবে রাষ্ট্রীয় নির্দেশের চক্র ভেঙে বিচার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে সাক্ষ্য ও ভিডিওপ্রমাণের ভিত্তিতে যুক্তি উপস্থাপন করেন এবং স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীদের পাল্টা বক্তব্যের জবাব দেন। সবশেষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন আসামিপক্ষের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা বক্তব্য তুলে ধরেন। এই যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পরই ১৩ নভেম্বর আদালত রায়ের তারিখ ঘোষণা করে।
মামলার মূল অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো আন্দোলনের সময় ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের সরাসরি নির্দেশদাতা হিসেবে শেখ হাসিনার ভূমিকার দাবি। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো, ড্রোন আক্রমণ, হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দমন অভিযান, ট্রিগার পয়েন্টে সশস্ত্র বাহিনী ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের অবস্থান—এসবের পেছনে ছিল কেন্দ্রীয় নির্দেশ। এসব অভিযানে দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন এবং প্রায় ২৫ হাজার মানুষ আহত হন, যাদের অনেকেই আজীবন পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে আছেন। এ অভিযোগগুলো সাক্ষ্য, ভিডিও, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং রাজসাক্ষীর বয়ানের মাধ্যমে আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়।
অভিযোগপত্রে রংপুরের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদের হত্যার ঘটনাও বিস্তারিতভাবে উঠে আসে। কেবল একজন ছাত্র নয়, পাঁচ আগস্ট চানখাঁরপুলে ছয় ছাত্রকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, আশুলিয়ায় ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ছাত্রদের গুলি করে হত্যা এবং পরে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ভয়ংকর ঘটনাও এই মামলার অংশ। এসব ঘটনায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ছিল বলে দাবি করেছে প্রসিকিউশন। আদালতে সদ্যসাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তিদের বিবরণেও উঠে এসেছে সেই নির্মমতা। কেউ বলেছেন, আহত অবস্থায় বন্ধুকে কোলে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন; কেউ দেখেছেন ভিড়ের মধ্যে হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ গুলিতে লুটিয়ে পড়া মানুষের দেহ; কেউ বর্ণনা করেছেন ট্রাকভর্তি অস্ত্রধারীদের আগমন এবং বিক্ষোভের ওপর গুলির বৃষ্টি।
আজকের রায়টি শুধু আদালতের সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর কাছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক উত্তরণ। নিহতদের মা-বাবা, ভাইবোন কিংবা সন্তানরা আদালত প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। কারও হাতে থাকবে প্রিয়জনের ছবি, কারও চোখে থাকবে অশ্রু আর ক্ষীণ আশা। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই দিনগুলোতে যারা প্রিয়জন হারিয়েছিলেন, অনেকেই আজও সেই স্মৃতি ভুলতে পারেননি। নিহতদের মধ্যে ছিল স্বপ্ন দেখার বয়সের শত শত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র, শ্রমিক, চাকরিজীবী, এমনকি পথচলার মানুষও। রায়ের দিনটি তাই তাদের কাছে কেবল আইনগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং হারানো স্মৃতিকে সম্মান জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
আজকের রায় সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন। আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে বিশ্ব গণমাধ্যমও তা প্রচার করবে। ট্রাইব্যুনালের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকেও লাইভ দেখানো হবে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দায় রায় দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষও এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে পারেন।
প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন গতকাল এক ব্রিফিংয়ে জানান, এই মামলার পাঁচটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও বলেন, রায়ের ক্ষেত্রে নারী হওয়ায় শেখ হাসিনা কোনো বিশেষ সুবিধা পাবেন না, কারণ ট্রাইব্যুনালের আইনে এ ধরনের কোনো ব্যতিক্রম নেই। অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি হবে আইনের বিধান অনুযায়ী; আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তিনি খালাস পাবেন।
আজকের রায়ের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাবও ব্যাপক। দণ্ডিত হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মাঝে বিতরণের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া দণ্ড ঘোষিত হলে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার প্রস্তুতিও চলছে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যারা প্রাণ দিয়েছেন, তারা ন্যায়বিচার পাবেন কিনা, সেটাই আজ নির্ধারিত হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত এসেছে। কিন্তু আজকের দিনের তাৎপর্য ভিন্ন। এটি কেবল এক ব্যক্তির বিচার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, গণহত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থানকে পরিষ্কারভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার এক নতুন অধ্যায়। আজকের রায় ভবিষ্যতের জন্য ন্যায়, সততা এবং মানবাধিকারের পথচিত্র নির্ধারণ করবে—এমনটাই আশা সবার।