শেখ হাসিনার মামলায় ট্রাইব্যুনালে রায় পড়া শুরু

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫২ বার
শেখ হাসিনার মামলায় ট্রাইব্যুনালে রায় পড়া শুরু

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সোমবার দুপুর ১২টার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় পড়া শুরু করেছে। দেশের ইতিহাসে এটিই বিশেষ নজরকাড়া ঘটনা, যেখানে ক্ষমতাচ্যুত এক প্রধানমন্ত্রী এবং তার সরকারের উচ্চপদস্থ নেতাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী কার্যক্রমের দায়ে রায় ঘোষণা করা হচ্ছে।

ট্রাইব্যুনালে উপস্থিতি নিয়েছেন বিভিন্ন অনাস্থাপ্রকাশকারী ছাত্র ও নাগরিক সমাজের নেতারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাবেক সহ-সভাপতি সাদিক কায়েম, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। তাদের চোখে ছিল উত্তেজনা, প্রত্যাশা আর দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অনুভূতি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রাঙ্গণে রায় শোনার জন্য ভিড় করছেন সাধারণ মানুষও, যারা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় নিহত বা আহত ব্যক্তিদের পরিবার এবং প্রতিবেশী।

এই মামলার অপর দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। মামুনই একমাত্র গ্রেফতারকৃত আসামি; তিনি ‘রাজসাক্ষী’ হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান পলাতক রয়েছেন। মামলার রায় ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), রয়টার্স এবং ট্রাইব্যুনালের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে, যাতে দেশের প্রতিটি কোণে জনগণ তা সরাসরি জানতে পারে।

মামলার প্রসিকিউশন গত ১ জুন শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়। প্রথম অভিযোগটি হলো, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্য, যা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালানোর নির্দেশ হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ‘নির্মূলের নির্দেশ’ দেওয়া হয়েছিল। তৃতীয় অভিযোগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা, চতুর্থে রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা, এবং পঞ্চম অভিযোগে আশুলিয়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর বিস্তৃত সহিংসতা চালিয়ে ছয়জনকে পোড়ানোর ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই পাঁচটি অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১০ জুলাই ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়।

মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘ ও বিস্তারিত। মোট ৫৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন আন্দোলনে আহত ও পরিবারের সদস্যরা, যারা সরাসরি হত্যাকাণ্ড ও হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে কিশোর ও যুবকরা কীভাবে সেনাবাহিনী এবং সশস্ত্র দলের হাতে আহত বা নিহত হয়েছে, এবং আহতদের মধ্যে অনেকেই আজও স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারিক প্যানেলকে বলা হচ্ছে, তারা রায়ের মাধ্যমে শুধু আইনগত দৃষ্টিকোণ নয়, মানবিক ও নৈতিক দিকও বিবেচনা করবেন। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার অফিস জানিয়েছে, আজকের রায় পড়ার সময় প্রত্যেক ধাপ বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হবে। এতে সাধারণ জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রায়ের পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি দেখতে পারছে।

বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে এই তিন সদস্যের প্যানেলে রয়েছেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। তাদের দায়িত্ব ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত অভিযোগগুলো পর্যবেক্ষণ করা, সমস্ত সাক্ষী জবানবন্দি, প্রমাণাদি এবং প্রসিকিউশন ও ডিফেন্সের যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে রায়ের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এই মামলার রায় শুধু এক ব্যক্তি বা দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতান্ত্রিক অধিকার, মানবাধিকার এবং বিচার ব্যবস্থার শক্তি প্রদর্শনের দিকেও নজর দিয়েছে। দেশজুড়ে সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এখন ট্রাইব্যুনালের দিকে। কেউ আশা করছেন নিরপেক্ষ বিচার হবে, কেউ আবার উদ্বিগ্ন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে কিনা।

রায়ের ঘোষণার আগ মুহূর্তে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। এই কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে যে, বিচারপ্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে এবং জনসাধারণের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনও ধরনের প্রভাব পড়বে না।

সাক্ষী ও অভিযোগ বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় নিরীহ মানুষদের ওপর প্রমাণিত সহিংসতা, হত্যা ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড ঘটেছে। এই ঘটনায় নিহতের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার এবং আহতের সংখ্যা ২৫ হাজারেরও বেশি। অনেকের স্থায়ী অঙ্গহানি হয়েছে, চোখ হারানো বা মানসিক ক্ষতির মতো জটিল পরিস্থিতিতে তারা আজও জীবন কাটাচ্ছেন। ট্রাইব্যুনালের রায় শুধুমাত্র আইনগত প্রমাণের উপর নির্ভর করছে না, এটি হত্যিতন্ত্রের শিকড় ও দায়িত্বশীলতার হিসাব নিকাশও প্রকাশ করবে।

এই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু একটি মামলার বিচার দেখছে না; এটি দেখছে কীভাবে একটি দেশের উচ্চপদস্থ ব্যক্তির কর্মকাণ্ড দেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে। রায়ের ফলাফলের প্রতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতিটি নাগরিকের প্রত্যাশা রয়েছে, যে এটি দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং আইনের শাসন শক্তিশালী করবে।

এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরও বাংলাদেশের উপর। মানবাধিকার সংস্থা, সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সরাসরি এই রায়ের প্রতিফলন পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা জানাচ্ছেন, রায় মানবতাবিরোধী অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দেশের স্থিতিশীলতা এবং বিচার ব্যবস্থার ক্ষমতা প্রদর্শন করবে।

সোমবার দুপুরে ট্রাইব্যুনালে রায় পড়া শুরু হলেও দেশের প্রত্যেক কোণে এই রায়ের প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। মানুষের চোখে উত্তেজনা, প্রত্যাশা, এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার স্বপ্নের প্রতিফলন। আজকের রায় বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত