মামলার সাক্ষীরা চাইলেন শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৩ বার
রাজউক প্লট দুর্নীতিতে হাসিনার ২১ বছর কারাদণ্ড

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রাঙ্গণে প্রবেশের আগে মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা তাদের প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন। জুলাই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দুই সহযোগীসহ তিন আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন তারা। এই রায় শুধু আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নয়, আহত ও নিহতদের পরিবার এবং সমগ্র জাতির জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

নিউরো সায়েন্স হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মাহফুজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি সাক্ষী দেওয়ার দিনও উত্তেজিত ছিলাম। আজও আবেগে চলে আসছি। আপনারা জানেন, নিউরো সায়েন্সে ১৬৭ জন রোগীর বেশির ভাগই মাথার খুলি ছাড়া এসেছে। তাদের আমি চিকিৎসা দিয়েছি। নির্মমতার সাক্ষী আমি। যার কারণে সব শহীদ ও আহতদের জন্য আমি গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাসহ আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আদেশ দিয়ে ক্ষান্ত হলেই চলবে না। তাদের দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’

ডা. মাহফুজুর আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়ে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি। আমি বাংলাদেশের পক্ষে। শেখ হাসিনার ভারতপ্রেমিতার বিরুদ্ধে।’ তাঁর সঙ্গে ছিলেন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসায় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে নিয়োজিত ছিলাম। আমি আজ এসেছি যাতে আন্দোলনে আহত আমার ভাইয়েরা ইনসাফ পায়।’

মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন চলাকালীন সময়ে হাসিনা বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক এবং পদ্ধতিগত দমনপীড়নের সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সব বাহিনী, আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠন, বিশেষ করে ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ চালানোর নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন। এই কারণে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি আহত হয়। অনেকের স্থায়ী অঙ্গহানি হয়েছে, চোখ হারানোসহ মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছে বহু মানুষ।

প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বিক্ষোভকারীদেরকে ‘রাজাকারের বাচ্চা, রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে উল্লেখ করেন। তার নির্দেশ ও প্ররোচনার ফলে আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র দলের সদস্যরা ব্যাপক মাত্রায় নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালায়।

দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করে নির্মূল করার নির্দেশ’ দিয়েছেন। এটি বাস্তবায়ন করেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন।

তৃতীয় অভিযোগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদের হত্যার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। চতুর্থ অভিযোগে রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, ষড়যন্ত্র এবং সম্পৃক্ততার দায় শেখ হাসিনা ও অন্য দুই আসামির ওপর চাপানো হয়েছে।

পঞ্চম অভিযোগে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সময় আশুলিয়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো গুলিবর্ষণ এবং লাশ পোড়ানোর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় একজনও জীবিত ছিল। শেখ হাসিনা ও দুই সহযোগী এই হামলার নির্দেশদাতা হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়িত্বে আছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্যানেল আজ সকাল ১১টায় বসে। ট্রাইব্যুনালে উপস্থিতি এবং নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রাঙ্গণে মোতায়েন আছেন। এতে নিশ্চিত করা হচ্ছে, বিচার প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে এবং জনসাধারণের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হবে না।

এই রায়ের মাধ্যমে শুধু আইনগত বিচার নয়, দেশের সাধারণ মানুষ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা দেখতে পাবেন, কীভাবে বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ নেতাদের কর্মকাণ্ড দেশের নাগরিকদের জীবন ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষত, নিহত ও আহতের পরিবার এই রায়কে দীর্ঘদিনের ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যাশা করছেন।

আজকের রায় বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি দেশের বিচারব্যবস্থার শক্তি প্রদর্শন করবে এবং ভবিষ্যতের জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। সাক্ষীদের আবেগ, ট্রাইব্যুনালের ন্যায়পরায়ণতা এবং নাগরিকদের প্রত্যাশা মিলে এই রায়কে দেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্থান করে দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত