প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বহুল প্রত্যাশিত রায় ঘোষণা হচ্ছে, যা দেশের ইতিহাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সরকারের সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রথম বিচারের রূপ নেবে। জুলাই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত ঘটনা নিয়ে দায়ের করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল। মামলার রায়ের আগে বিচারকরা ট্রাইব্যুনাল চত্বরে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে হাসিনা এবং তাপসের ফোনালাপও পড়েছেন।
ফোনালাপটি থেকে জানা যায়, ওই সময় শেখ হাসিনা ও তার সহযোগী তাপস দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে পরিকল্পনা করছিলেন। কথোপকথনের সূচনা থেকেই স্পষ্ট হয় যে, ফোনালাপে আসন্ন হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল। শেখ হাসিনা তাপসকে বলেন, “এটাই তাদের আকাঙ্ক্ষা। আমি সেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা বলছি, ওরা রেডি থাকবে। এখন আমরা ড্রোন দিয়ে ছবি নিচ্ছি, হেলিকপ্টার দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।”
তাপস উত্তরে জানান, “জ্বি, আমি টেকনিক্যালি বুঝছি, কিন্তু মনে হয় ওরা ঐ পথে নেয়ার জন্যই করছে।” শেখ হাসিনা তখন নির্দেশ দেন, রাতের মধ্যে সব সংশ্লিষ্টকে ধরা হোক, এবং কোথায় গেদারিং হচ্ছে, সেখানে লেথাল ওয়েপন ব্যবহার করে সরাসরি গুলি চালাতে হবে। এই নির্দেশনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ও স্থানে পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা চালানোর নির্দেশ ছিল।
ফোনালাপে আরও উঠে আসে, বিভিন্ন স্থানে আগুন লাগানো, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পুড়িয়ে দেওয়া, এবং গণমাধ্যম বন্ধ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, “বিআরটি, বিটিআরসি, বিটিভি সব পোড়ানো হয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ, এখন চলবে কিভাবে?” তাপস উত্তরে নিশ্চিত করেন যে, সমস্ত কার্যক্রম রাতের মধ্যে সম্পন্ন হবে।
এই ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালের জন্য এক শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যা দেখাচ্ছে যে, জনসমুদ্রে শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। মামলায় আরও উঠে আসে যে, শেখ হাসিনার নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র ছাত্রসংগঠন এবং দলীয় ক্যাডাররা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। ফলস্বরূপ দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ২৫ হাজার মানুষ আহত হয়। অনেকের স্থায়ী অঙ্গহানি ঘটে, চোখ হারানোসহ মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির শিকার হন বহু মানুষ।
মামলার তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে, প্রধান অভিযোগগুলো হলো: ১৪ জুলাই ২০২৪ সালে গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান, হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ‘নির্মূল করার নির্দেশ’, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে হত্যা, রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পোড়ানোর ঘটনা। এই অভিযোগগুলোতে তিন আসামির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা, সহায়তা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় চাপানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্যানেল এই মামলার রায় ঘোষণা করবেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই বিচারক হলেন মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। রায়ের আগে সশস্ত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং সেনাবাহিনী প্রাঙ্গণে মোতায়েন থাকায় নিশ্চিত করা হচ্ছে, বিচার প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা বজায় থাকবে।
এক পর্যায়ে এই মামলায় দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্যতা উদঘাটনে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হয়ে সাক্ষ্য দেন। তিনি জানান, অভিযোগে উল্লেখিত প্রতিটি পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়েছিল এবং ঘটনাস্থলে তার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল।
উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আরও দুটি মামলা রয়েছে। এক মামলায় ১৫ বছরের শাসনামলে আওয়ামী লীগের গুম-খুনের ঘটনায় তাকে আসামি করা হয়েছে। আরেকটি মামলা হচ্ছে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে। এই সব মামলা এবং আজকের রায় মিলিয়ে দেশের ইতিহাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের রায় শুধু আইনগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি দেশের নাগরিকদের জন্য ন্যায়ের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হবে। আহত ও নিহতের পরিবার, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই রায়ের দিকে দৃষ্টি রাখছেন। রায়ের ফলাফলের মাধ্যমে বাংলাদেশে ভবিষ্যতের জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধের দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হবে।
শেখ হাসিনার ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে পড়ার ঘটনা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তি ও তাদের সহযোগীরা কখনোই আইন ও ন্যায় থেকে উপরে নয়। রায় ঘোষণার এই মুহূর্তে গোটা জাতি, দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সক্রিয় নজর রাখছে, যেন নিশ্চিত হওয়া যায়, ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সঠিকভাবে চিহ্নিত ও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।