প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনার নাম প্রথমে আসে স্বৈরাচারী ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে। কারও কাছে তিনি ফ্যাসিস্ট, আবার সমর্থকদের কাছে উন্নয়নের কর্ণধার। প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের দীর্ঘতম সময় রাষ্ট্র পরিচালনাকারী। কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ সবসময় একরূপ থাকে না। গত কয়েক বছরে তার রাজনীতির চিত্র পাল্টেছে, আর এখন তিনি সেই পথে দাঁড়িয়ে আছেন, যা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য—ফাঁসির দণ্ডের মুখে।
শেখ হাসিনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর পিতার হত্যা সহ্য করতে গিয়ে ছয় বছরের নির্বাসন কাটান। এই সময়কাল বেহাল অবস্থার মধ্যেও তিনি তার রাজনৈতিক সংযোগ বজায় রাখেন এবং ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের শূন্যপ্রদানে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে তিনি দলের সভাপতি হন এবং শুরু করেন নিজের রাজনৈতিক প্রভাবকে দৃঢ় করার সংগ্রাম।
৮০-এর দশকের শেষার্ধে তিনি এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও শেখ হাসিনার অবস্থান শক্ত ছিল। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে দল হেরে গেলেও, ১৯৯৬ সালের জুনে সপ্তম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিজয়ী হয়। এরপর থেকে তিনি নেতৃত্বের আসনে দৃঢ়ভাবে টিকে থাকেন।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয়ে ফিরে আসে ক্ষমতায়। ২০০-র বেশি আসন জয়ের মাধ্যমে দলের ক্ষমতা প্রসারিত হয়। সংবিধানে বিভিন্ন পরিবর্তন, দীর্ঘ মেয়াদে শাসন ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ—এই সব ঘটনা শেখ হাসিনার শাসনযুগকে চিহ্নিত করেছে। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে একাধিক নির্বাচনে তিনি নিজের আসন ধরে রাখেন, কখনো বিনা প্রতিদ্বন্দীতায়, কখনো নির্বাচনী কৌশলে। ক্ষমতায় টিকে থাকার তার পরিকল্পনা ছিল সুচিন্তিত এবং নিখুঁত।
কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঢাকার রাস্তায় একটি নতুন ইতিহাস লেখা হয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কোটার দাবির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের বৈষম্য দুরীকরণের হাতিয়ার হিসেবে রূপ নেয়। সরকারী নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যত আন্দোলন দমন করতে গিয়ে প্রাণ হারান কয়েকশো মানুষ। সাধারণ জনস্রোতের ক্ষোভ এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করার চেষ্টায় শেখ হাসিনার রাজনৈতিক শক্তি পরিমাপের সীমা ছুঁয়েছিল।
অপরদিকে, জনতার প্রতিবাদ এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের উপর দায় চাপানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়। গণভবনের দিকে শিক্ষার্থীদের ঢল পৌছানোর আগে শেখ হাসিনা দাপুটে প্রতাপশালী হিসেবে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পলাতক হন। এই সময়কাল রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকে। তিনি ভারতের সহায়তায় নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন, কিন্তু জাতির ক্ষোভ তার রাজনীতিকে সঙ্কুচিত করে।
জুলাই গণহত্যার বিচারের সূচনা হয় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। শেখ হাসিনা এই মামলার প্রধান আসামি হিসেবে আদালতে হাজির হননি, কিন্তু তার রাজনীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ মামলার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার হয়। বিচার প্রক্রিয়ার সময় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হন। আদালত তার সাক্ষ্য, দলীয় ও প্রশাসনিক নথি বিশ্লেষণ করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দণ্ড নিশ্চিত করে।
আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যমে এই রায় ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ব্রিটিশ, ভারতীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক গণমাধ্যমগুলো রায়ের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি এক অনন্য ঘটনা, যেখানে সরকারের সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তিকে আন্তর্জাতিক বিচারের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা থেকে বর্তমান পরিস্থিতি—এটি এক বিস্ময়কর পরিণতির গল্প। পিতার হত্যা, নির্বাসন, ক্ষমতায় দীর্ঘ সময় টিকে থাকা, জনগণের ক্ষোভ, আন্দোলনের দমন এবং অবশেষে পলাতক অবস্থায় ফাঁসির দণ্ডের মুখে পড়া—এই ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় রাজনীতির ঘনিষ্ঠ ও মানবিক প্রেক্ষাপট প্রকাশ করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুগে যুগে বিশ্বের বহু স্বৈরশাসক এবং শক্তিধর নেতা তাদের শাসন জীবনের শেষ দিকে ফাঁসি বা কারাবাসের মুখোমুখি হয়েছেন। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে এই ঘটনা একই রকম ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর, ইন্টারপোলের মাধ্যমে তার ফেরত আনা, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারের প্রস্তুতি—সব কিছু এখন নজরদারির কেন্দ্রবিন্দুতে।
দেশের সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এই ঘটনার মাধ্যমে শেখ হাসিনার ক্ষমতার সীমা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব এবং রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছেন। জনগণের মধ্যে এখন এক ধরনের আশ্বাস এবং সমালোচনার মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, দেশের বিচার প্রক্রিয়া ইতিহাসের পথে নতুন এক অধ্যায় রচনা করছে।
রাজনীতি ও ইতিহাসের এই মিলিত অধ্যায় প্রমাণ করছে, ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। জনমানুষের ক্ষোভ, আন্দোলন এবং সামাজিক ন্যায়ের ডাক সবসময় একটি রাষ্ট্রনায়ককে তার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া দেয়। শেখ হাসিনার চার দশকের রাজনীতি, শেষ পর্যন্ত ফাঁসির দণ্ডের মুখোমুখি হওয়া—এই ইতিহাস পাঠককে রাজনৈতিক দায়িত্ব, ক্ষমতার সীমা এবং মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মনিটরিং, দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা সবাই এই রায়ের প্রভাবের দিকে তাকিয়ে আছেন। ভারতের অবস্থান, ইন্টারপোলের ভূমিকা এবং দেশের অন্তর্বর্তী সরকার—সব মিলিয়ে একটি জটিল রাজনৈতিক ও মানবিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত, শেখ হাসিনার চার দশকের রাজনৈতিক জীবন, ক্ষমতায় থাকা, আন্দোলন দমন, জনগণের ক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক বিচারের মুখোমুখি হওয়ার গল্প আমাদের সামনে রেখেছে এক রাজনৈতিক নাটক যা ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় থাকবে।