রাজসাক্ষী হওয়ায় কমল সাজা: সাবেক আইজিপি মামুনের ৫ বছরের দণ্ড

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৫ বার
রাজসাক্ষী চৌধুরী মামুনের কারাভোগে নতুন সিদ্ধান্ত

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ৪৫৩ পৃষ্ঠার বিস্তৃত রায়ের মাধ্যমে আজ যে রায় ঘোষণা করা হলো, তা শুধু এই মামলার তিন আসামির ভাগ্যই নির্ধারণ করেনি, বরং দেশের ন্যায়বিচার ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী অধ্যায়ও যুক্ত করেছে। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে—যদিও মামুনের অপরাধের মাত্রা সর্বোচ্চ সাজার যোগ্য ছিল, তবুও সত্য উদ্ঘাটন এবং রাষ্ট্রকে তথ্যসহায়তার কারণে তাকে কম সাজায় দণ্ডিত করা হয়েছে।

সোমবার দুপুরে বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় ঘোষণা করেন। অন্যান্য সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। দুপুর ঠিক ১২টা ৩৪ মিনিটে রায়ের সারাংশ পাঠ শুরু হয় এবং প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরার পর আনুষ্ঠানিকভাবে রায় ঘোষণা করা হয়। ট্রাইব্যুনাল জানায়, ৩৬ দিনের সেই আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনাগুলোর প্রমাণ, সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই এই বিস্তারিত রায় প্রস্তুত হয়েছে।

রায়ে বিচারক পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেন যে, চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন সরকারি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এবং ঘটনার প্রকৃতি ও মাত্রা সম্পর্কে তিনি পূর্ণ অবহিত ছিলেন। তিনি আদালতে স্বীকার করেন—তৎকালীন পরিস্থিতির পুরো সময় তিনি ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং একইসঙ্গে চলমান দমন-পীড়নের বাস্তবতা সম্পর্কে জানতেন। তাঁর এই স্বীকারোক্তি তদন্তকে নতুন গতিতে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে এবং ট্রাইব্যুনালের সামনে ঘটনাগুলোর প্রকৃত রূপ তুলে ধরে। এই কারণেই ট্রাইব্যুনাল তার স্বীকারোক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। আদালত মন্তব্য করে—অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তার সাজা মৃত্যুদণ্ডও হতে পারত, কিন্তু সত্য উন্মোচনে সহযোগিতার কারণে তা কমিয়ে পাঁচ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আদালতের দৃষ্টিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

এই মামলার অপর দুই আসামি—ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল—পলাতক অবস্থায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। রায়ে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, তাদের নামে দেশে থাকা সব সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেয়া হবে। ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়া, তাদের অপরাধবোধ ও দায় এড়ানোর প্রবণতারই প্রতিফলন। আদালত আরও মন্তব্য করে যে, এই অপরাধ কেবল ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভয়াবহ আঘাত এবং জনগণের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

আইনজীবীরা বলছেন, এই রায় শুধুমাত্র একটি মামলার রায় নয়; এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। প্রথমবারের মতো দেশের সর্বোচ্চ স্তরের দুজন সাবেক শীর্ষ নীতিনির্ধারক মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং সর্বোচ্চ সাজা পেয়েছেন। আবার একই মামলায় সাবেক পুলিশ প্রধান রাজসাক্ষী হয়ে ঘটনাগুলো প্রকাশ করার ফলে কম সাজার সুযোগ পেয়েছেন। এই বৈপরীত্যকে আইনি মহল বিচারব্যবস্থার পরিপক্বতা হিসেবে দেখছেন।

প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার ব্রিফিংয়ে জানান, অভিযোগগুলিতে যে অপরিসীম নৃশংসতা ফুটে উঠেছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কৃষ্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। তিনি বলেন, পলাতক থাকায় শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান কামাল আপিল করতে পারবেন না। আইনের বিধান অনুসারে, পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা আপিলের অধিকার হারান। রায়ের মাধ্যমে আদালত আরও স্পষ্ট করে দেন যে, দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি আসামির শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে তারা কোনো আইনগত সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না।

মামলার ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, গত ১ জুন এই তিন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন দল। তদন্ত রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি, ডিজিটাল প্রমাণ এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষে পাঁচটি গুরুতর অভিযোগ গঠন করা হয়। অভিযোগগুলোতে বলা হয়, গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশ দেন। তিনি পরবর্তী সময়ে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের নির্মূলের নির্দেশ দেন, যা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এছাড়া রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা, রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগও এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের দিন আদালতে স্বীকার করেন যে, তিনি তৎকালীন সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি জানান, পরিস্থিতির চাপ, প্রশাসনিক আদেশ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তিনি এমন ভূমিকা রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে তিনি আদালতে স্পষ্ট করে বলেন যে, এই ঘটনাগুলোকে তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে দেখেন এবং সত্য প্রকাশের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের কাছে দায়মুক্ত হতে চান। আদালত তার এই বক্তব্যকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায় নেয়।

রায় ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো লাইভ সম্প্রচারে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে। আদালত এলাকার বাইরে মানুষের ঢল নামে; কেউ বিস্মিত, কেউ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন, আবার অনেকে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর রায় হাতে পাওয়ায় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তুফান ওঠে। কেউ রায়কে যুগান্তকারী বলে মনে করেন, কেউ এর নৈতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করেন, আবার অনেকে আইনি দৃষ্টিকোণে রায়ের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। দেশের বড় বড় মোড়গুলোতে স্থাপিত বড় পর্দায় রায় দেখার জন্য জমে ওঠা মানুষের ভিড় প্রমাণ করে—এই বিচার কেবল আদালতের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের হৃদয়েও গভীরভাবে আলোড়ন তুলেছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই রায় বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত, এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। দ্বিতীয়ত, মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচার নিশ্চিত করা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন আরও শক্তিশালী হয়েছে। তৃতীয়ত, এই রায় ভবিষ্যতে প্রশাসন ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে—রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন রাষ্ট্রের কাছে তার ভুল স্বীকার করায় যেভাবে পাঁচ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেন, তা বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তার স্বীকারোক্তি আদালতের প্রক্রিয়া সহজতর করেছে এবং জনগণকে সত্য জানার সুযোগ দিয়েছে। যদিও তিনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশীদার ছিলেন, তবুও সত্য প্রকাশের কারণে তার সাজা কমেছে—এটি বিচারব্যবস্থায় মানবিকতা এবং বাস্তবতার সমন্বয়ের একটি উদাহরণ।

মামলার অন্য দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হওয়া, পলাতক অবস্থায় আপিলের সুযোগ না থাকা, এবং দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সম্ভাব্য উদ্যোগ—সব মিলিয়ে এই রায় আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশের রাজনীতি, আইন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

আজকের এই রায় বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এবং ইতিহাসের জন্য এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগের বিচারে এই রায় জনমানসে ন্যায়বিচারের প্রতি নতুন আস্থা তৈরি করেছে এবং প্রমাণ করেছে—অপরাধ যত বড়ই হোক, সত্য এবং বিচার একদিন প্রকাশ পেতেই পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত