রুয়েট ভর্তি ২৩ জানুয়ারি: দুই কেন্দ্রে অভিন্ন প্রশ্নে নতুন অভিজ্ঞতা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৮ বার
রুয়েট ভর্তি ২৩ জানুয়ারি: দুই কেন্দ্রে অভিন্ন প্রশ্নে নতুন অভিজ্ঞতা

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়—রুয়েট—বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন বুনে আসছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর মনে। উচ্চমাধ্যমিক শেষে যারা ইঞ্জিনিয়ারিং পেশাকে ভবিষ্যতের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয়, তাদের জন্য রুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মানে জীবনের বড় একটি ধাপ। সেই বাস্তবতার মধ্যেই এবার প্রথমবারের মতো রুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার কাঠামোয় যুক্ত হয়েছে নতুন এক অধ্যায়। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে রুয়েটের প্রথম বর্ষ স্নাতক ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২৩ জানুয়ারি, এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হবে দুই কেন্দ্র—রুয়েট ও বুয়েট—একই অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে।

রোববার জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) পদ্ধতিতে। রুয়েটের মোট বারো শতাধিক আসনের বিপরীতে প্রায় উনিশ হাজার শিক্ষার্থী এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। দেশের প্রকৌশল শিক্ষার তীব্র প্রতিযোগিতা, শিক্ষার্থীদের ভিড়, এবং কেন্দ্রভিত্তিক চাপ সামলাতে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের এই সিদ্ধান্তকে রুয়েটের একাধিক শিক্ষক ভবিষ্যতে আরও স্বচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। যদিও এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে প্রথমদিকে কিছু প্রশ্ন তুললেও সময়ের সঙ্গে তা স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

রুয়েটের ভর্তি পরীক্ষাকে ঘিরে প্রতিটি বছরেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয় বিশেষ ধরনের উত্তেজনা। কোচিং সেন্টারগুলোতে জায়গা হয় না ব্যাচ বাড়ানোর জায়গা সংকুলানের ভিড়ে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও ছুটে আসে এই স্বপ্নের পরীক্ষায় অংশ নিতে। রাজধানী, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহী অঞ্চলে কোচিং প্রস্তুতির সমান স্রোত লক্ষ্য করা যায়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগই পান না, বরং ভবিষ্যতে একজন প্রকৌশলী হিসেবে গড়ে উঠার বাস্তব যাত্রা শুরু হয় এখান থেকেই।

ভর্তি পরীক্ষার যোগ্যতা নিয়েও বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত জানানো হয়। দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বা কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে যারা ২০২২ বা ২০২৩ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় ন্যূনতম জিপিএ ৪.০০ অর্জন করেছেন, তারা আবেদন করতে পারবেন। উচ্চমাধ্যমিকে ২০২৫ সালে উত্তীর্ণ হতে হবে ন্যূনতম জিপিএ ৫.০০সহ। গণিত, পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে মোট ন্যূনতম জিপি ১৪ থাকতে হবে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে আসা শিক্ষার্থীরাই প্রকৌশল শিক্ষার ভিত্তিতে বেশি প্রস্তুত থাকে, তাই এই শর্তগুলো তাদের জন্য সাধারণত মানা সহজ হলেও প্রতিযোগিতার দিক থেকে তা যথেষ্ট কঠোর।

আন্তর্জাতিক ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থার শিক্ষার্থীরাও আবেদন করতে পারবেন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যারা জিসিই ‘ও’ লেভেলে অন্তত পাঁচটি বিষয়ে ন্যূনতম বি গ্রেড এবং জিসিই ‘এ’ লেভেলে গণিত, পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে পৃথকভাবে বি গ্রেড পেয়েছেন, তারা আবেদন করার যোগ্য। তবে শর্ত হলো—‘এ’ লেভেল সার্টিফিকেট অবশ্যই ২০২৪ সালের নভেম্বর বা তার পরের সময়ের হতে হবে। দেশের বাইরে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য এই শর্তটি তাদের শিক্ষাগত মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

ভর্তি পরীক্ষাটি শুধু একটি পরীক্ষা নয়; এটি হাজারো পরিবারের স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও দায়িত্বের একত্র বহিঃপ্রকাশ। একদিকে বাবা-মায়ের নিরন্তর উৎসাহ, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের অদম্য প্রচেষ্টা। সমাজের প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের কাছে এটি ভবিষ্যতের জীবনের পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিঁড়ি। বিশেষ করে যারা রুয়েটের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পায়, তারা দেশের বিভিন্ন বড় প্রকল্পে, বিদেশি গবেষণালয়ে এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়।

কিন্তু অভিন্ন প্রশ্নপত্রের পরীক্ষা প্রথমবার হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী মনে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। বুয়েটে পরীক্ষা হওয়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি কমবে বলে মনে করছেন অনেক অভিভাবক ও শিক্ষা বিশ্লেষক। আবার কেউ কেউ মনে করেন, একই প্রশ্নপত্রে দুই বড় প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা হওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। যাঁরা ঢাকা ও রাজশাহী উভয় স্থানেই পরীক্ষার সুযোগ পেতে পারেন, তাঁদের জন্য বিষয়টি একটি চ্যালেঞ্জই বটে। তবে রুয়েট কর্তৃপক্ষ বলছে, পরীক্ষা পরিচালনা ও ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি নিশ্চিত করা হবে।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা স্বাভাবিক। কারণ এই পরিবর্তন দুই দশকের ভর্তি পরীক্ষার প্রথায় নতুন রঙ যোগ করেছে। কোনো পরিবর্তনই শুরুতে প্রশ্ন সৃষ্টি করলেও সময়ের সঙ্গে তা নিজের জায়গা খুঁজে নেয়। একই সঙ্গে কেন্দ্রভিত্তিক চাপ কমানো এবং মানসম্মত ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনের ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা সবসময়ই কঠোর, পরিশ্রমসাপেক্ষ ও উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক। কিন্তু এটাই একজন প্রকৌশলী হওয়ার বড় পরীক্ষা। আগামী ২৩ জানুয়ারি লাখো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের পথচলার নতুন দরজা খুলবে। কেউ হয়তো সফল হবে, কেউ হতাশ হবে—কিন্তু প্রতিটি পরীক্ষার্থীই নিয়ে যাবে একটি মূল্যবান অভিজ্ঞতা, নতুন পথচলার অনুপ্রেরণা।

পরীক্ষার দিনে রাজশাহী ও ঢাকার কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা, পরিবহন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জল সরবরাহ, স্বাস্থ্য সহায়তা এবং অভিভাবকদের জন্য অপেক্ষার জায়গা বাড়ানোর বিষয়েও রুয়েট প্রশাসন গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ ভর্তি পরীক্ষা এখন কেবল একটি শিক্ষা কার্যক্রম নয়, বরং এটি একটি জাতীয় আয়োজনের মতোই গুরুত্ব বহন করে।

অবশেষে বলা যায়, নতুন বছরের প্রথম মাসেই প্রকৌশল শিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতার সূচনা হতে যাচ্ছে। রুয়েটে ভর্তি হতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এটি শুধু একটি পরীক্ষা নয়; এটি তাদের জীবনের আগামী দশকের ভিত্তি স্থাপনের অধ্যায়। সেই কারণে প্রস্তুতি, মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস—সবকিছুকেই সামনে নিয়ে এগোতে হবে। দেশের প্রকৌশল শিক্ষা ব্যবস্থায় রুয়েটের এই নতুন উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য আরও উন্মুক্ত এবং শক্তিশালী পথ তৈরি করবে—এমনই প্রত্যাশা সবার।

যারা স্বপ্ন নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে, তাদের জন্য শুভকামনা। ২৩ জানুয়ারি হাজারো শিক্ষার্থীর জীবনে নতুন সূর্যোদয়ের দিন হয়ে উঠুক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত