ব্রাকসু নির্বাচনের তফসিল এখনই চাই, শিক্ষার্থীদের আলটিমেটাম

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৭ বার
ব্রাকসু নির্বাচনের তফসিল এখনই চাই, শিক্ষার্থীদের আলটিমেটাম

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ ধীরে ধীরে জমে উঠছিল, তা রোববার বিকেলে এসে আরও প্রবল হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের বহুদিনের দাবি, বহুদিনের প্রস্তুতি এবং বহুদিনের প্রত্যাশার কেন্দ্রে থাকা ব্রাকসু—বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের নীরবতা ও বিলম্ব শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে উসকে দিয়েছে। অবশেষে তারা সরাসরি পদক্ষেপ নিয়ে ব্রাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. শাহাজামানের হাতে স্মারকলিপি প্রদান করেন এবং পরে সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট ও দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নির্বাচনের তফসিল প্রকাশ করতে হবে। অন্যথায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবে, আর এর সব ধরনের দায়ভার প্রশাসনকেই বহন করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে যে হতাশা ও ক্ষোভ মুখ ফুটে উঠে, তার পেছনে রয়েছে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ছাত্ররাজনীতিমুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধি নির্বাচনের স্থবিরতা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ছাত্র সংসদ নিয়ে নানা সময়ে আলোচনা হলেও কার্যকর নির্বাচন হয়নি অনেক বছর। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গঠনতন্ত্র সংশোধনসহ নানা প্রস্তুতির কথা জানালেও বাস্তব অগ্রগতি খুবই ধীর। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, প্রশাসনের এই বিলম্ব তাদের অধিকার ও প্রতিনিধিত্বকে উপেক্ষা করার সামিল।

জনসংযোগ দপ্তরের প্রান্তিক বার্তায় জানা গেছে, স্মারকলিপি জমা দেওয়ার সময় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত হয়ে তাদের দাবি একসুরে তুলে ধরেন। অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থী আহমাদুল হক আলবীর ইসলাম বলেন, তফসিল ঘোষণায় বিলম্ব শিক্ষার্থীদের মনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কেউ নিশ্চিত হতে পারছেন না নির্বাচন আদৌ হবে কি না। কয়েক মাস ধরে শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কতজন সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে নেমেছেন, কেউ পোস্টার বানাচ্ছেন, কেউ কমিটি গঠন করছেন—সবই হয়েছে স্বপ্ন নিয়ে। অথচ তফসিল না থাকায় পুরো প্রক্রিয়া অনির্দিষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, প্রশাসন শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি আন্তরিক না হলে এই হতাশা আরও বাড়বে। তাই তারা আশা করছেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিষ্কার সিদ্ধান্ত আসবে।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ক্যাম্পাসের ভেতরে বর্তমানে নীরব এক উত্তেজনা বিরাজ করছে। সবাই অপেক্ষা করছে কবে নির্বাচন হবে, কবে তফসিল ঘোষণা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবরই বলেছেন, চলতি বছরের মধ্যেই ব্রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই ঘোষণার ওপর ভিত্তি করেই শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিয়েছে। কিন্তু গঠনতন্ত্র পাওয়ার ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও প্রশাসন কোনো স্পষ্ট বার্তা দেয়নি। শামসুর রহমান মনে করেন, প্রশাসন সুস্পষ্ট একটি রোডম্যাপ দিলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্ট ধোঁয়াশা দূর হবে, আর ক্যাম্পাসে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় থাকবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয় এবং কোনো ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়, তার দায় সম্পূর্ণভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিতে হবে।

এদিকে ব্রাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. শাহাজামান শিক্ষার্থীদের স্মারকলিপি গ্রহণের পর সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন কমিশন কাজ করছে এবং খুব দ্রুত আচরণবিধি প্রকাশ করার চেষ্টাও চলছে। তিনি আশাবাদী যে শিক্ষার্থীদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া পেলে তা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনুমোদন এনে খুব শিগগিরই নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। তিনি আরও জানান, দেশের অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করেছে—বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুসরণ করে—তা বিবেচনায় নিয়ে ব্রাকসুর নীতিমালাও চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তার দাবি, নির্বাচন কমিশন দ্রুততম সময়ের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের জন্য কাজ করছে।

তবে শিক্ষার্থীদের হতাশা এত সহজেই লাঘব হচ্ছে না। গত কয়েক মাস ধরে ক্যাম্পাসে ছাত্রসংসদ নির্বাচন নিয়ে যে আলোচনার ঢেউ উঠেছে, তাতে দেখা গেছে ছাত্রদের মনে প্রত্যাশা যেমন আছে, তেমনি আশঙ্কাও রয়েছে। অনেকেই বলেন, ব্রাকসু নির্বাচন শুধু প্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় না, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারের প্রতীক। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ছাত্রদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি করবে এই নির্বাচন। এই অধিকার দীর্ঘ সময় ধরে অনুপস্থিত থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাবছেন। তাই ব্রাকসু নির্বাচন দ্রুত আয়োজন করাটা তাদের কাছে শুধু দাবি নয়, বরং অধিকারের প্রশ্ন।

বেরোবির ক্যাম্পাস দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। ব্রাকসু না থাকায় শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব গঠন এবং বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব অনুভব করছেন। ছাত্রসংসদ থাকলে শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো প্রশাসনের কাছে তুলে ধরার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। ফলে শিক্ষার্থীরা মনে করেন, ব্রাকসুর অনুপস্থিতি তাদের বাস্তব সমস্যাগুলোকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় রাজনীতিতেও অস্থিরতা রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হয়তো অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে। কিন্তু এই সতর্কতা যতই যৌক্তিক হোক, শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, তার ফলাফল হিসেবে তাদের দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে। একদিকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে বেরোবিতে এখনও তফসিল ঘোষণা হয়নি—এটিকে শিক্ষার্থীরা বৈষম্য এবং অবহেলা হিসেবে বিবেচনা করছেন।

শিক্ষার্থীদের মন্তব্যে দেখা গেছে, তারা প্রশাসনের প্রতি আস্থা হারাতে চান না; বরং চান একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সময়মতো সিদ্ধান্ত ও সুস্পষ্ট ঘোষণা। অনেক শিক্ষার্থী বলেছেন, তফসিল ঘোষণা না হলে নির্বাচন প্রস্তুতি নেওয়া সঠিকভাবে সম্ভব নয়। কেউ প্রচারণা শুরু করেছেন, কেউ সমর্থন জোগাড় করছেন—কিন্তু প্রশাসনিক অস্পষ্টতার কারণে পুরো প্রক্রিয়া ঝুলে আছে।

প্রশাসন যদিও বলছে সবকিছু প্রস্তুত হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন হলো—কখন? আর দেরি কেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করতে তেমন জটিলতা থাকার কথা নয়। তাহলে কেন এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি? এই প্রশ্নগুলোই আজ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের কেন্দ্রে।

পরিস্থিতির অগ্রগতির দিকে তাকিয়ে আছে পুরো ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা আশাবাদী, তাদের দাবি প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। যারা ব্রাকসুর ইতিহাস নতুন করে গড়তে চান, যারা ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাদের আশা—২৪ ঘণ্টার মধ্যে তফসিল প্রকাশ হলে নতুন একটি সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে যাবে।

সবশেষে বলা যায়, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধু একটি নির্বাচন চান না, তারা চান জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং অংশগ্রহণমূলক বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ। ব্রাকসু নির্বাচন সেই স্বপ্নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কত দ্রুত শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে সিদ্ধান্ত নেয় এবং ক্যাম্পাসে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত