প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতপ্রেমীদের জন্য সিজন-৩-এর সমাপ্তি হয়ে উঠেছে এক অনবদ্য মুহূর্তে। কোক স্টুডিও বাংলার এবারের সিজন শেষ হলো বাংলাদেশের সংগীত আইকন রুনা লায়লার কণ্ঠে ‘মাস্ত কালান্দার’-এর নতুন পরিবেশনার মাধ্যমে। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগীতের মাধ্যমে ইতিহাস রচনার মধ্য দিয়ে যাওয়া রুনা লায়লা এবার এই চিরজীবী সুফি গানটি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, যেখানে ঐতিহ্য, আধুনিকতা এবং আধ্যাত্মিকতা একসাথে মিলিত হয়েছে।
আজ রোববার, রুনা লায়লার জন্মদিনের ঠিক আগের দিনে গানটি প্রকাশ করা হয়েছে। কোক স্টুডিও বাংলা এই মুহূর্তটিকে বাংলাদেশের সংগীত ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের একটি বিশেষ অনুষ্ঠান হিসেবে দেখেছে। গানটি শায়ান চৌধুরী অর্ণব ও অদিত রহমান প্রযোজিত, যেখানে কাওয়ালির আধ্যাত্মিক সুর, বাংলার লোকজ ভাব এবং আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। গানটির শুরুতেই মাখন মিয়ার কণ্ঠে হাসন রাজার বাংলা গানের একটি ছোট অংশ শোনা যায়, যা শোনার সঙ্গে সঙ্গে শ্রোতাদের হৃদয়ে নস্টালজিয়া জাগায়। এরপর ধীরে ধীরে গানটিতে সুফি ঘরানার গভীরতা, লোকজ ছন্দ এবং সমসাময়িক বাদ্যযন্ত্রের ছোঁয়া যুক্ত হয়েছে, যা গানের ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে।
গানে অংশ নিয়েছেন দুই প্রজন্মের শিল্পীরা। ফুয়াদ নাসের বাবু এবং কোক স্টুডিও বাংলার নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা একত্রিত হয়ে গানটিকে একটি তাজা আবহে ধরা দিয়েছেন। ফলে শোনার সময় শ্রোতা এক সঙ্গে নস্টালজিক অভিজ্ঞতা ও নতুন রঙের সংমিশ্রণ অনুভব করতে পারছেন। রুনা লায়লার কণ্ঠের জাদু, তরুণ শিল্পীদের প্রাণবন্ত পরিবেশনা এবং আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণ একটি অভূতপূর্ব সংগীতানুভূতি তৈরি করেছে।
রুনা লায়লা দীর্ঘ সংগীতজীবনে ‘মাস্ত কালান্দার’-কে একটি বিশেষ স্থান দিয়েছেন। তিনি ১৮টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়েছেন এবং বাংলাদেশের সীমা পেরিয়ে ভারত, পাকিস্তানসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতের সেতুবন্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কোক স্টুডিও বাংলার এই নতুন উপস্থাপনাই তার ঐতিহাসিক সংস্করণকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছে। রুনা লায়লা বলেন, “মাস্ত কালান্দার সব সময়ই আমার হৃদয়ের খুব কাছের একটি গান। তরুণ শিল্পীদের সঙ্গে নতুনভাবে গানটি গাইতে পেরে আমি আনন্দিত। প্রজন্ম-পরম্পরায় গানটি নতুনভাবে ফিরে আসায় আমি সত্যিই খুশি।”
শায়ান চৌধুরী অর্ণব কোক স্টুডিও বাংলার আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে শুরু থেকেই এই সিজনের কিউরেশন, গায়ক এবং সুরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে কোক স্টুডিও বাংলার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরেছেন। অদিত রহমানের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় গানটিকে এক যুগোপযোগী আঙ্গিকে সাজানো হয়েছে। অদিত রহমান ‘সন্ধ্যাতারা’, ‘নাসেক নাসেক’ এবং ‘ভবের পাগল’-এর মতো জনপ্রিয় গানের আধুনিকায়নের জন্য সুপরিচিত। তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সিজন-৩-এর সমাপ্তি হয়ে উঠেছে হৃদয়স্পর্শী এবং স্মরণীয়।
‘মাস্ত কালান্দার’ কেবল একটি গান নয়, এটি বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুফি আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে বাংলার লোকসঙ্গীত এবং আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণ শ্রোতাদের মুগ্ধ করছে। গানটি সীমান্ত পেরিয়ে বহু মানুষের কাছে পৌঁছালেও, এর শেকড় বাংলাদেশের সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে। এটি প্রমাণ করে, কোক স্টুডিও বাংলা শুধুমাত্র বিনোদনের প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও প্রসারিত করার একটি মাধ্যম।
সিজন-৩-এর সমাপ্তি কেবল একটি অনুষ্ঠান বা একটি গানের প্রকাশ নয়; এটি বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্ত। রুনা লায়লার কণ্ঠে গানটি শোনার সময় শ্রোতাদের মনে হয় যেন এক সময়ের সুর, কল্পনা এবং সংস্কৃতি আবার নতুন রঙে ফিরে এসেছে। এই নতুন পরিবেশনা শুধু শ্রোতাদের জন্য নয়, বরং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
এই গানের মাধ্যমে কোক স্টুডিও বাংলা প্রমাণ করেছে যে, তাদের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র গানের মান বৃদ্ধি করা নয়, বরং বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক মানে তুলে ধরা। রুনা লায়লার কণ্ঠের স্বতন্ত্রতা, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উদ্যম এবং সৃজনশীল প্রযোজনার সমন্বয় একসাথে গড়ে তুলেছে একটি হৃদয়স্পর্শী অভিজ্ঞতা।
সিজন-৩-এর সমাপ্তি হলো বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়, যেখানে পারস্পরিক প্রজন্মের সংযোগ, আধ্যাত্মিক সুরের সঙ্গে আধুনিকতার সংমিশ্রণ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সুরক্ষার এক নজির স্থাপন হয়েছে। ‘মাস্ত কালান্দার’-এর এই নতুন রূপে রুনা লায়লা এবং কোক স্টুডিও বাংলার প্রচেষ্টা প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশের সংগীতের জগত এখন শুধু দেশের মধ্যে নয়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
অবশেষে, রুনা লায়লার কণ্ঠের ছোঁয়া, কোক স্টুডিও বাংলার শিল্পী ও প্রযোজকদের নিষ্ঠা এবং শ্রোতাদের ভালবাসা মিলিত হয়ে সিজন-৩-কে একটি চিরস্মরণীয় অধ্যায়ে পরিণত করেছে। গানটি শুধুমাত্র শেষের অংশ নয়, বরং নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নতুন যাত্রার সূচনা, যা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক এবং সংগীত ঐতিহ্যকে ধরে রাখবে আগামী বছরগুলোতে।