প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতে পালিয়ে থাকা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় শুধু ঢাকা নয়, উত্তপ্ত করে তুলেছে ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লি থেকে শুরু করে কলকাতার রাজনৈতিক অঙ্গনও। বাংলাদেশে যেখানে রায় ঘোষণার পর বিবিধ স্থানে মিষ্টি বিতরণ, আনন্দ মিছিল ও নিহতদের পরিবারের অশ্রুসিক্ত স্বস্তির প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, সেখানে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় মহানগর কলকাতা এবং রাজধানী দিল্লিতে সৃষ্টি হয়েছে ভিন্ন পরিবেশ। বিশেষ করে শরণার্থী হিসেবে সেখানে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার ছায়া।
বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে, সেই আদালতটি গঠনের সূচনা করেছিলেন স্বয়ং শেখ হাসিনা। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর তিনি বিশেষ এই আদালতকে যুদ্ধাপরাধের বিচার মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেও সেই আদালতের প্রক্রিয়া নিয়ে দেশে-বিদেশে তীব্র সমালোচনা ছিল। ভারতের কিছু বুদ্ধিজীবী এবার একই সুরে ট্রাইব্যুনালকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ আখ্যা দিয়েছেন। তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালটি পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সংশোধন করে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বিচার পরিচালিত হয়েছে—এই বাস্তবতা ভারতীয় আলোচনার পরিসরে তুলনামূলক কম থাকলেও রাজনৈতিক উত্তাপ ও আবেগময়তা ঢেকে রেখেছে সে বিষয়গুলোকে।
ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার শুরু থেকেই শেখ হাসিনাকে রক্ষার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তা সত্ত্বেও দেশটির বামপন্থী ও নাগরিক সমাজের একাংশ ভিন্ন সুরে কথা বলছেন। তাদের মতে, যিনি নিজের দেশে গণহত্যার দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত, তাকে আশ্রয় দেওয়া বা দীর্ঘসময় ধরে রাজনৈতিক ঢাল দিয়ে রক্ষা করা কোনো ভাবেই নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। কলকাতার প্রখ্যাত কবি ও সম্পাদক অতনু সিংহ এই রায়ের পর স্পষ্টভাবে বলেছেন, খুনি হাসিনাকে যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো উচিত। চলচ্চিত্র পরিচালক সৌমিত্র দস্তিদার আরও তীক্ষ্ণ ভাষায় মন্তব্য করেন, নরেন্দ্র মোদি সরকার যখন অনুপ্রবেশ রোধ নিয়ে এত তৎপর, তখন তাদের উচিত হাসিনাকে নিজ দেশে প্রত্যর্পণ করা। এসব বক্তব্য কলকাতায় রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, বিশেষত সেখানে অবস্থানরত পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে।
এদিকে কলকাতার নিউটাউনের শাপুরজি এলাকায় পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের অস্থায়ী কার্যালয়ে সোমবার বিকাল চারটায় জরুরি বৈঠক ডাকলেও সেখানে কেউ উপস্থিত হননি। শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়ে প্রত্যেকেই বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন। উপস্থিত না হওয়া নেতারা নিজেরাই স্বীকার না করলেও স্থানীয় মহলের ধারণা, এটি নিছক অসুস্থতা নয়, বরং মৃত্যুদণ্ডের রায় তাদের ভেতরকার আতঙ্ককে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে বক্তব্য-বিবৃতিতে চড়া গলায় হুমকি–ধমকি দিয়ে আসছিলেন, সেই নেতাদের আচরণে এখন অস্থিরতা স্পষ্ট। তাদের নিজের ভবিষ্যৎ যে অনিশ্চিত, তা রায়ের পর আরো পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। তারা আশা করলেও যে ভারত নতুন কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বা ন্যারেটিভ তৈরি করে তাদের রক্ষা করবে, বাস্তবে সম্ভাবনা কমে এসেছে নানা আইনি জটিলতার কারণে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এখন ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করার জন্য। রায় ঘোষণার পরই এই দাবি নতুন মাত্রা পায়। তবে নয়াদিল্লি এ দাবি রাখবে কি না, তা নিয়ে এখন তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জল্পনা চলছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি গত অক্টোবরেই বলেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ বিচার বিভাগীয় ও আইনি প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত, এবং প্রয়োজনীয় আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও জানিয়েছিলেন, তারা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের পাঠানো চিঠির বৈধতা যাচাই করছেন।
এক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি মূল বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ২০১৩ সালে হওয়া এই চুক্তিতে দুটি শর্ত ভারতকে এই মুহূর্তে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। চুক্তি বলছে, যদি কোনো অপরাধ রাজনৈতিক চরিত্রের হয়, তবে অভিযুক্তকে প্রত্যর্পণ করতে বাধ্য নয় ভারত। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক অনিন্দ্যজ্যোতি মজুমদার মনে করেন, বাংলাদেশে হাসিনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলার সুযোগ তৈরি করতে পারে ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্র। একই আলোচনার সুর তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ইমনকল্যাণ লাহিড়িও, যিনি মনে করেন, রাজনৈতিক সংজ্ঞা ব্যবহার করে ভারত সহজেই প্রত্যর্পণ এড়িয়ে যেতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী। তিনি বলেছেন, রায়ের পর শেখ হাসিনার প্রাণসংকটের সম্ভাবনা রয়েছে—এমন দাবি তুললে ভারত চুক্তির সেই ধারা ব্যবহার করতে পারে, যেখানে বলা আছে প্রাণহানির আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ফেরত পাঠাতে কোনো রাষ্ট্র বাধ্য নয়। এর সঙ্গে সংগতির বিষয়টি উল্লেখ করেন কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী অরিন্দম দাস। তার মতে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি জীবন-ঝুঁকিতে পড়তে পারেন এমন দেশে তাকেও ফেরানো যাবে না। এছাড়া বর্তমানে তিনি বাংলাদেশে না থাকায় সুপ্রিম কোর্টে আপিলের সুযোগ না পাওয়াও তার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল, যা প্রত্যর্পণ ঠেকানোর আরেকটি ভিত্তি হতে পারে।
এসব আইনি যুক্তি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ভেতর দ্বিধা যে তৈরি হয়েছে, তা নয়াদিল্লির নীরবতা থেকেও বোঝা যায়। যেন সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে আছে। কারণ শেখ হাসিনা শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি নন, বরং দীর্ঘদিন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি কৌশলগত উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। তাই তাকে ফেরানো হলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হতে পারে, আর না ফেরালে বাংলাদেশের দুর্বল অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
কলকাতার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও দেখা যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য চাপ। পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারা ইতোমধ্যে তাদের আইনজীবীদের মাধ্যমে প্রত্যর্পণ এড়াতে নতুন কৌশল খুঁজছেন। তারা চাচ্ছেন বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে উপস্থাপন করতে, যাতে ভারতের কাছে তাদের অবস্থান নিরাপদ থাকে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের আর্তনাদ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের স্পষ্ট অভিযোগ এখন ভারতীয় বুদ্ধিজীবী মহলেও আলোচনায় উঠেছে।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় শুধু রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থারই একটি অধ্যায় নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনীতি, মানবাধিকারের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক আইন এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের এক জটিল মোড়। ভারতের কলকাতা থেকে নয়াদিল্লি পর্যন্ত বিস্তৃত উদ্বেগের রেখায় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চিত, তেমনি তার অনুগত নেতাদেরও ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন। রায় কার্যকের আগ পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।










