প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব এক অধ্যায়ের পর্দা উঠেছে সোমবার। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা এবং পরবর্তীতে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড শুধু দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নয়, বিশ্ব ইতিহাসেও এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত হিসেবে যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে, প্রায় আড়াই শতাব্দী পর কোনো নারী সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড এই রায়কে আরও ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ করেছে।
রায়ের পরে বাংলাদেশের আদালত প্রাঙ্গণ, রাজনৈতিক অঙ্গন কিংবা সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া—সব জায়গায় ছিল তীব্র আলোড়ন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত দেড় হাজারের বেশি মানুষের পরিবারের জন্য এই রায় বহু প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ মনে করা হচ্ছে। বিচারকরা তাদের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং দলীয় ক্যাডারদের ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমনে শেখ হাসিনার নির্দেশই ছিল সহিংসতার মূল উৎস। এই নির্দেশেই নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর ভয়াবহ হামলা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ এবং ব্যাপক নির্যাতন সংঘটিত হয়।
এই রায়ের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নাম যুক্ত হলো সেসব ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান ও একনায়কের তালিকায়, যারা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে ইতিহাসের কঠোরতম বিচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন থেকে শুরু করে সার্বিয়ার স্লোবোদান মিলোশেভিচ কিংবা বসনিয়ার রাদোভান কারাদজিক—বিশ্ব রাজনীতির নানা অধ্যায়ে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার দায়ে এসব নাম জায়গা করে নিয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে তাই প্রবল আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, সর্বশেষ কোনো নারী সরকারপ্রধান মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন ফরাসি বিপ্লবের সময়। ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুইয়ের স্ত্রী, কুখ্যাত মারি এন্তনে ১৭৯৩ সালের অক্টোবর মাসে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। এরপর প্রায় ২৩২ বছর কেটে গেছে—কোনো দেশেই কোনো নারী রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান এমন শাস্তির মুখোমুখি হননি। ফলে এই রায়ের প্রতিটি পর্যায় আজ বিশ্ব সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে গভীর নজরদারির বিষয় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে যে দিন রায় ঘোষণা করা হয়, সেদিন আদালতের আশপাশে কঠোর নিরাপত্তা ছিল। রায় শোনার পর নিহতদের স্বজনদের বুকভরা কান্না ও স্বস্তির মিশ্র অনুভূতি টিরশেটে দেখা যায়। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, সংগ্রাম ও ক্ষোভ যেন এক মুহূর্তে উথলে ওঠে। যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন, তাদের কাছে এই রায়ের গুরুত্ব অবর্ণনীয়। তাদের অনেকেই বলছিলেন, “আজ মনে হচ্ছে তাদের আত্মা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।”
রায়ের মাধ্যমে আরেক আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও একই সাজায় দণ্ডিত হয়েছেন। আর সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হওয়ায় লঘুদণ্ড হিসেবে পেয়েছেন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। আদালত তাদের অপরাধের বিবরণ তুলে ধরে জানিয়েছে, তারা রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগে উৎসাহিত করেছিলেন এবং ঘটনাস্থলে না থেকেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নির্দেশনাই ছিল সহিংসতার প্রধান চালিকাশক্তি।
বিচারের নথিতে যে পাঁচটি অভিযোগ ছিল, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন। তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযানে পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী এবং দলীয় ক্যাডাররা সমন্বিতভাবে অংশ নেয়। এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও গুলি চালানোর ঘটনা আদালতের সামনে প্রমাণিত হয়—যা নজিরবিহীন। এসব অভিযানে দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়, এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত বা অঙ্গহানি নিয়ে আজীবন পঙ্গুত্বের শিকার।
অতীতে বিভিন্ন দেশের কর্তৃত্ববাদী নেতাদের বিচার প্রক্রিয়া ও শাস্তির দিকে তাকালে বোঝা যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধ কোনোভাবেই ক্ষমার অযোগ্য। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে ধরা হয়েছিল ২০০৩ সালে, বিচার শেষে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। বসনিয়ার নেতা কারাদজিক দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন, অবশেষে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। মিলোশেভিচ আদালতের রায়ে পৌঁছার আগেই মারা যান, যার ফলে তার বিচার অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। এসব উদাহরণ বিশ্বসভ্যতার অতীত ভুলকে শোধরানোর প্রচেষ্টা। এবার সেই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হলো বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রায় শুধু রাজনৈতিক নির্বাসনে থাকা একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে দণ্ড নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষের জীবনবিনাশের বিরুদ্ধে এক নৈতিক বিদ্রোহ। ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত তরুণদের স্মৃতির প্রতি একরকম সম্মান। যারা রাস্তায় বেরিয়ে গণতন্ত্রের দাবিতে জীবন দিয়েছেন, তাদের রক্ত যেন আর বৃথা না যায়—এই রায়ের মাধ্যমে সে প্রত্যাশাই আরও দৃঢ় হয়েছে।
এ রায়ের পর আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়াও ভিন্নধর্মী। অনেক দেশ ন্যায়বিচারের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করলেও কিছু মানবাধিকার সংগঠন মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছে। তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বক্তব্য স্পষ্ট—এ বিচার কোনো প্রতিশোধ নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা, নির্যাতন ও হত্যার বিরুদ্ধে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একটি কঠোর কিন্তু অপরিহার্য পদক্ষেপ।
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দিল্লির অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। দুটি দেশের মধ্যে থাকা বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ভারতের সিদ্ধান্তকে জটিল করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত চাইলে রাজনৈতিক চরিত্রের মামলা, জীবন-ঝুঁকির সম্ভাবনা অথবা বিচারপ্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া ইত্যাদি যুক্তি দেখিয়ে তাকে হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। ফলে শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার লড়াই আরও দীর্ঘ হতে পারে।
তবে বাংলাদেশে এই রায়ের গুরুত্ব ঐতিহাসিক। দীর্ঘ দমন-পীড়নের অন্ধকার অধ্যায়ের পর আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে সুর শোনা গেল, তা দেশে নতুন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যারা আন্দোলনে অংশ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের ঘরে ঘরে আজও শোকের ছায়া, তাদের প্রতি এ যেন রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়বদ্ধতার জবাব।
এই রায় প্রমাণ করেছে, ক্ষমতার ওপরে মানুষ নয়; আইনের ওপরে কেউ নয়। আর ২৩০ বছরের ইতিহাস ভেদ করে প্রথমবারের মতো একজন নারী সরকারপ্রধানের এই শাস্তি বিশ্বসভ্যতার কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে—মানবতাবিরোধী অপরাধ সময় ও ক্ষমতার কোনো ছায়া পায় না, ন্যায়বিচারের আদালত একদিন তা ধরেই ফেলে।