প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সাম্প্রতিক রায়। গত বছরের জুলাই মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা এখন শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এর প্রতিক্রিয়ায় জেনেভা থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর)। সংস্থাটির মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি সোমবার দেওয়া বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই রায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি মুহূর্ত।
গত বছরের বিক্ষোভ দমনের সময় সংঘটিত সহিংসতার ভয়াবহতা এখনও অনেক পরিবারের স্মৃতিতে তাজা। অগণিত মানুষ সেই সময় রাস্তায় নামেন গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারের দাবিতে। তাদের অনেকেই আর ঘরে ফিরতে পারেননি। কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন চোখ, হাত বা পায়ের মতো অঙ্গ, আর অনেকে এখনো শারীরিক-মানসিক ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। দীর্ঘ এই যন্ত্রণার পর আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঘটনার দায় নির্ধারণ হওয়াকে ওএইচসিএইচআর ভুক্তভোগীদের জন্য এক বিরল স্বস্তি ও ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছে।
বিবৃতিতে শামদাসানি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে— বিক্ষোভ দমনের সময় রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ওপর উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা ছিল। সে সময় থেকেই ওএইচসিএইচআর দাবি জানিয়ে আসছিল, নির্দেশনা ও নেতৃত্বের অবস্থানে থাকা ব্যক্তিসহ সকল দায়ীকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অনেক দিন ধরে ভুক্তভোগীদের পরিবারও একই সুরে বলছিলেন— অপরাধীদের বিচার না হলে দেশের মানুষের রাষ্ট্রের ওপর আস্থা ফিরে পাওয়া কঠিন হবে।
তবে ওএইচসিএইচআর এটিও স্পষ্ট করেছে যে তারা বিচারকার্য সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেনি। ফলে রায়ের কারিগরি দিক বা বিচার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে তারা স্বাধীনভাবে মন্তব্য করেনি। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী যেকোনো জবাবদিহির ক্ষেত্রে ন্যায্যতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা যে অপরিহার্য, সেই নীতিগত অবস্থান থেকেই সংস্থাটি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে দোষীর অনুপস্থিতিতে দেওয়া এই রায় এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তির বিষয়টির প্রতি। শামদাসানি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘ সব অবস্থাতেই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে, কারণ এটি মানুষের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং মানবিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রায়ের পর দেশে যেভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এবং বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, সেই নতুন প্রেক্ষাপটে ওএইচসিএইচআর শান্ত ও সংযত আচরণের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি মনে করছে, এই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন আরও গভীর ও কঠিন এক পথে হাঁটতে শুরু করেছে— সত্য উদ্ঘাটন, ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধের লক্ষ্যে পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনার পথ। মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক তার মন্তব্যে বলেছেন, বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ তৈরি হয়েছে একটি রূপান্তরমূলক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ার, যেখানে সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা, নিরাপত্তা খাতের সংস্কার এবং ন্যায়ের প্রতি সামগ্রিক প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে কাজ করবে।
বাংলাদেশে গত বছরের আন্দোলন—যেখানে তরুণ-তরুণী, শ্রমিক, ছাত্র, চাকরিজীবী, শিক্ষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ প্রাণপণ লড়েছিলেন—তার লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, নির্বিচার গুলিবর্ষণ, নিখোঁজের ঘটনা এবং নির্যাতনের শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে আন্তর্জাতিক মহলও বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। জাতিসংঘের তদন্ত দল বহু সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে, ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সেই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ঘটনাগুলো ছিল পরিকল্পিত ও সমন্বিত, যার কেন্দ্রে ছিল রাজনৈতিক নির্দেশ।
বিচার শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহল আদালতের কার্যক্রমে নজর রাখছিল। যদিও আদালত তাদের কাজ স্বাধীনভাবে করেছে বলে বাংলাদেশ সরকার বারবার দাবি জানিয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু প্রশ্ন ছিল স্বচ্ছতার এবং যথাযথ আইনি তদারকির। ওএইচসিএইচআর সেই প্রশ্নগুলোকে তুলে ধরে বলেছে, বিশেষ করে অনুপস্থিতিতে বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড—উভয় বিষয়েই আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী একটি কঠোর পর্যালোচনা প্রয়োজন।
আদালতের রায়ের পর নিহতদের পরিবার স্বস্তি ও শোকের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অনেকেই বলেছেন, রায় তাদের বহু দিনের বেদনায় খানিকটা শান্তি এনে দিয়েছে। তরুণদের অনেকেই মনে করছেন, এই রায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রথমবারের মতো তাদের সংগ্রামের মূল্যায়ন করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু শাস্তি নয়, সত্য উদ্ঘাটন এবং সকল ভুক্তভোগীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া—এসবই হবে বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়ের মৌলিক ভিত্তি।
ওএইচসিএইচআর তার বিবৃতিতে বাংলাদেশের জন্য আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা দিয়েছে—নিরাপত্তা খাতে সংস্কার। সংস্থাটি বলেছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে তাদের কাঠামো, তদারকি এবং জবাবদিহি—সবকিছুকেই আন্তর্জাতিক মান অনুসারে নতুন করে সাজাতে হবে। এই সংস্কার ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ হওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। জাতিসংঘ বাংলাদেশকে এই পুরো প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বাংলাদেশ এখন এক জটিল ও সংবেদনশীল পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে মানুষের প্রত্যাশা—আইনের শাসন যেন সত্যিকারের অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি আবারও দৃঢ়ভাবে ফিরে আসে। ওএইচসিএইচআর মনে করে, এই রায় সেই যাত্রার একটি সূচনা মাত্র। আরও অনেক কাজ বাকি, যেহেতু ন্যায়বিচার কেবল সাজা নয়, বরং সত্য, স্বচ্ছতা এবং সমগ্র সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
জেনেভা থেকে পাঠানো বিবৃতির শেষ অংশে রাভিনা শামদাসানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরেছেন—বাংলাদেশ যাতে ন্যায়বিচারের পাশাপাশি একটি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যেতে পারে, সে জন্য জাতিসংঘ সবসময় সহযোগিতায় প্রস্তুত। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ কিভাবে এই রায়ের পরবর্তী অধ্যায় সামলাবে, এবং কতটা সক্ষম হবে সত্য, ন্যায় ও মানবাধিকার ভিত্তিক একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নির্মাণে।










