রায় লেখা ছিল দেয়ালে দেয়ালে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩০ বার
রায় লেখা ছিল দেয়ালে দেয়ালে

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায়গুলোর একটি হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনকাল। সেই সময়টিকে অনেকে বর্ণনা করেন দমন-পীড়ন, গুম-খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের এক অবিরাম শৃঙ্খল হিসেবে। গণঅভ্যুত্থানের আগ মুহূর্তে তিনি কার্যত দেশের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন—এমন অভিযোগও ঘনঘন উঠে এসেছে গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে। জনবিক্ষোভের মুখে তার পতন ও হঠাৎ দেশত্যাগের ঘটনা তাই অনেকের চোখে ইতিহাসের এক অনিবার্য ফল। দেশের মানুষের আর্তনাদে যে বিচারের দাবি তীব্র হয়েছিল, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে সেই আহ্বানেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে বিচার প্রতিষ্ঠা শুধু কোনো ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভেতরে যে নৈতিক মেরুদণ্ড তৈরি হয়, তা ভবিষ্যতের নেতাদেরও সতর্ক করে দেয়। ক্ষমতা কতটা সীমাবদ্ধ, অপব্যবহারের পরিণতি কত গভীর হতে পারে—রায়ের মাধ্যমে তা প্রজন্মের পর প্রজন্মের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডাদেশ তাই শুধুমাত্র তার একক অপরাধের বিচার নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি নতুন প্রতিশ্রুতির এক মাইলফলক।

ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং ঘটনাবলির বিবরণ ছিল বেদনাদায়ক। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল উসকানিমূলক বক্তব্য, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ, রংপুরে এক শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যা, ঢাকার চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধ। শুধু তাই নয়, সাভারের এক ঘটনায় যাদের দেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল, তাদের একজন তখনো জীবিত ছিলেন—এমন তথ্য আদালতে উঠে এলে আদালতকক্ষটিতে উপস্থিত অনেকের চোখে পানি চলে আসে। রাষ্ট্র কোনোদিনই এমন ঘটনার সামনে দাঁড়িয়ে নিশ্চুপ থাকতে পারে না।

অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র ব্যক্তি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন আদালতে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। তার ভাষ্যে উঠে আসে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহারের। ১৮ জুলাইয়ের সেই নির্দেশই ছিল পরবর্তী হত্যাকাণ্ডগুলোর মূল ভিত্তি। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকা আসাদুজ্জামান খান সে সময় এমন নির্মমতার অন্যতম কারিগর হিসেবে পরিচিত হন। দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনি স্বয়ং নির্দেশ দিতেন কিভাবে বিক্ষোভ দমনের নামে মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে হবে।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো ঘটে শিশুদের নিয়ে। গণঅভ্যুত্থানের সময় নিহতের তালিকায় যে ১৩৩ শিশুর নাম উঠে এসেছে, তাদের গল্পগুলো শুধু পরিবার বা আত্মীয়তার বেদনাই নয়, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ওপর গভীর দায়বদ্ধতার বার্তা দেয়। ঢাকার রায়েরবাগে চার বছর বয়সী আহাদ যখন বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে গুলি খেয়ে পড়ে যায়, তখন কেউ ভাবতেও পারেনি এই ঘটনা জাতির বিবেককে কতটা নাড়া দেবে। পরদিন হাসপাতালে চার বছরের ছোট্ট প্রাণটি নিভে গেলে যে কান্না বয়ে যায়, তা গোটা দেশকে শোকাহত করে তোলে। একইভাবে ছয় বছরের রিয়া গোপ, দশ বছরের সাফকাত সামির কিংবা পনেরো বছরের নাঈমার মৃত্যুও দেশের আকাশে অসহ্য ভার তৈরি করে। হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলিতে যখন শিশু-কিশোররা মারা যাচ্ছিল, তখন আকাশও যেন আতঙ্কে থমকে গিয়েছিল।

শুধু শিশু নয়, ছাত্র-জনতার সারি সারি প্রাণহানি দেশের প্রতিটি মানুষকে শোকীর্ণ করে তোলে। জুলাই-আগস্টের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে দেশের দেয়ালজুড়ে মানুষের ক্ষোভ ফুটে উঠেছিল—‘খুনি হাসিনার ফাঁসি চাই’। এটি ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া, একটি শোকস্তব্ধ দেশের ন্যায়বিচারের আর্তনাদ। রায় ঘোষণার পর শহীদ পরিবারের সদস্যরা স্মৃতির ভারে ভেঙে পড়েন। বহু পরিবার বিচার সম্পন্ন হলেও অপরাধীর উপস্থিতি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, দেশত্যাগ করে তিনি বিচার এড়ানোর চেষ্টা চালিয়েছেন।

ভারত থেকে শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠরা যে ধারাবাহিকভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন—তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি—সেটি ট্রাইব্যুনালের আইনি প্রেক্ষাপটে ভিত্তিহীন দাবি হিসেবে উদ্ঘাটিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে পলাতক আসামি নিজ ইচ্ছায় আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না ঠিকই, তবে অভিযুক্তের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ আদালত রেখেছে। অর্থাৎ আইনি প্রক্রিয়ার কোনোটাই তার বিরুদ্ধে একতরফা হয়নি। তিনি চাইলে দেশে ফিরে বিচার মোকাবিলা করতে পারতেন, কিন্তু সেই সাহস তিনি দেখাতে চাননি। তার অবস্থান থেকে প্রতীয়মান হয়, তিনি আদালতের প্রতি যতটা না অবিশ্বাসী, তার চেয়েও বেশি ভীত ছিলেন নিজের অতীতের ভয়াবহ সিদ্ধান্তগুলোর মুখোমুখি হতে।

শুধু গণঅভ্যুত্থানের সময়ের হত্যাকাণ্ড নয়, শেখ হাসিনার পুরো শাসনামলে গুম, খুন এবং নির্যাতনের ঘটনা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও পোক্ত করেছিল। ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু করে শত শত মানুষের গুমের রহস্য আজও অন্ধকারে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার যে কৌশল তিনি প্রয়োগ করেছিলেন, তা অনেক বিশ্লেষকের মতে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দেয়। আদালতে উপস্থাপিত ফোনালাপ, নির্দেশ ও সরকারি নথিতে তার ঠান্ডা মাথায় হত্যার অনুমোদনের চিত্র উঠে এসেছে।

আজকের রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ তাদের নিজস্ব শক্তির ওপর আস্থা ফিরে পাচ্ছে। জনগণের আত্মত্যাগের যে ইতিহাস তৈরি হয়েছে, তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে এই বিচার। কোনো ব্যক্তি ক্ষমতাধর হলেই যে আইন তার কাছে নতি স্বীকার করবে না, বরং অপরাধ করলেই রাষ্ট্র তাকে জবাবদিহির আওতায় আনবে—এমন বার্তা দেশ আবারও পেল।

রাষ্ট্রচিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো—স্বৈরশাসকের বিচার প্রতিশোধ নয়, এটি জাতির নৈতিক ভিত্তিকে সোজা করার প্রক্রিয়া। বিচার না হলে ইতিহাস বিকৃত হয়, অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং ভবিষ্যতের নেতারা একই ভুল করার সাহস পায়। শেখ হাসিনার বিচারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, তা তাই শুধু একটি মামলার রায় নয়—একটি জাতির আত্মসম্মান, ন্যায়বোধ এবং রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার পুনরুদ্ধারের প্রতীক।

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে রক্ত দিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি সম্মান জানাতেই এই বিচার প্রয়োজন ছিল। রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী যেই হোক, তার শাস্তি নিশ্চিত করা মানেই ন্যায়বিচারের জয়। এই রায় সেই আশাকে দৃঢ় করেছে। বাংলাদেশের জনগণ এখন আরও শক্ত কণ্ঠে বলতে পারছে, রায়ের শব্দে শুধু বিচারই হয়নি—রাষ্ট্র ঘোষণা করেছে, জনগণই ক্ষমতার উৎস, জনগণের রক্তই ন্যায়বিচারের পথচলার ভিত্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত