প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ডেঙ্গু বেইজারি এখনো থামেনি। সোমবার (১৭ নভেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দেশে নতুন করে আরও তিনজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এ খবরের সঙ্গে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১,০০৭ জন রোগী। চলতি বছর এখনও পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৩৩৯ জনের, যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে।
ডেঙ্গুর ঋতুতে প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। রোববার (১৬ নভেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদফতরের পূর্বের সংবাদে জানানো হয়েছিল, একদিনে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১,১৩৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে, ডেঙ্গু রোগ এখনও দেশে অতি মারাত্মকভাবে বিস্তার করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন পরিস্থিতিতে জনগণকে সচেতন হওয়া এবং সরকারী স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা আরও সক্রিয় হতে হবে।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত, সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন। সেই একই সময়ে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭৫ জনে। তুলনামূলকভাবে, ২০২৩ সালে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ ছিল; সেদিনে ১,৭০৫ জন মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। এই তুলনায় দেখা যায়, ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমে এসেছে, তবে এখনও এটি স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম প্রধান কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু একটি জীবাণুজনিত রোগ যা মশার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। সাধারণত এডিস মশা ডেঙ্গুর বাহক। শহরের আবাসিক এলাকা, বিশেষ করে যেখানে পানি জমে থাকে, সেখানে মশার প্রজনন বেশি হয়। তাই ডেঙ্গুর বিস্তার রোধের জন্য নাগরিক সচেতনতা অপরিহার্য। স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সাধারণ মানুষকে একসাথে কাজ করতে হবে। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা জল অপসারণ করা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা এই রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে প্রায়শই জ্বর, মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা, বমি এবং ক্লান্তি দেখা যায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, রোগের প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা না নিলে এটি জীবনঘাতী হতে পারে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের চিকিৎসা মূলত ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, হাইড্রেশন এবং প্রয়োজনে রক্ত প্রতিস্থাপন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
সরকারি স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং নগর প্রশাসন প্রতিনিয়ত নগরীতে মশক নিধন কার্যক্রম চালাচ্ছে। স্প্রে এবং ফগিং-এর মাধ্যমে মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তবে এমন পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র প্রশাসনের উপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। নাগরিকদের নিজস্ব দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি। বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় জল জমে না রাখার পাশাপাশি প্রতিদিন মশার দমন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করলে ডেঙ্গুর বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের ভর্তি সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। বড় শহরগুলোতে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়, এই রোগের সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে বেশি। ঢাকা শহরের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত ব্যবস্থা নিলে ও প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করলে রোগীর মৃত্যু হ্রাস করা সম্ভব। তবে যথাযথ চিকিৎসা না পেলে রোগীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ডেঙ্গুর প্রভাব কেবল স্বাস্থ্য খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাজ থেকে বিরতি নিতে হয়, যা পরিবারের আর্থিক অবস্থা প্রভাবিত করে। এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খরচ, ওষুধপত্র এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। তাই দেশের প্রতিটি স্তরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।
চলতি বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নভেম্বর মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যু সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন, জলাবদ্ধতা এবং মানুষজনের অসচেতনতা মিলে এই রোগের বিস্তার বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে শহুরে এলাকা এবং বস্তি এলাকায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
সরকারি স্বাস্থ্য অধিদফতর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রচারণা চালাচ্ছে। টেলিভিশন, রেডিও এবং সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ, প্রাথমিক লক্ষণ ও জরুরি চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ ওয়ার্ড ও আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।
ডেঙ্গু রোগের বিরুদ্ধে সাফল্যের জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং জনগণ একসাথে কাজ করলে মাত্র কয়েক মাসে রোগের বিস্তার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা পুনরায় সতর্ক করেছেন, “যদি ডেঙ্গুর প্রাথমিক সতর্কতা এবং নিয়মিত পরিচর্যা অবহেলা করা হয়, তাহলে সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।”
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলা যায়, জনগণকে অবশ্যই ঘরে ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, মশারি ব্যবহার করা, স্যানিটেশন বজায় রাখা এবং জ্বর বা অন্যান্য ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া উচিত। এছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, নিয়মিত হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
সর্বশেষে বলা যায়, ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখনো দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সোমবারের মৃত্যুর সংখ্যা এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর তথ্য এ চ্যালেঞ্জকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। তাই শুধু প্রশাসন নয়, জনগণকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করাই দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল চাবিকাঠি।
সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, সোমবার (১৭ নভেম্বর) দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১,০০৭ এবং নতুন মৃত্যু ৩ জন। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু ৩৩৯ জনে পৌঁছেছে। এই তথ্য দেখিয়ে দিচ্ছে যে, রোগ এখনো নিয়ন্ত্রণে নেই এবং সতর্কতা অবলম্বন অপরিহার্য।