প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের ইসলামিক ফিন্যান্স খাতকে আরও শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে রাজধানীর হোটেল শেরাটনে শনিবার অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ ইসলামিক ফিন্যান্স সামিট–২০২৫। এটি দেশের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক মানের পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ফাইন্যান্স সামিট হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এই সম্মেলন দেশি-বিদেশি নীতিনির্ধারক, শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ, বিনিয়োগকারী এবং ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্টদের মিলনমেলা হিসেবে অভিজ্ঞতার এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম উপস্থাপন করেছে।
আইএফএ কনসালটেন্সির আয়োজনে এবং আন্তর্জাতিক শরিয়াহ মানদণ্ড প্রণয়নকারী সংস্থা অ্যাওফি (বাহরাইন)-এর সহযোগিতায়, সিটি ইসলামিকের উপস্থাপনায় এবং অ্যারিস্টোফার্মা লিমিটেডের সমর্থনে এই সামিট অনুষ্ঠিত হয়। সামিটের মূল প্রতিপাদ্য ছিল “Overcoming the Challenges in the Islamic Finance Industry in Bangladesh 2.0,” যা দেশের ইসলামিক ফিন্যান্স খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে আলোচনা করার একটি বিশেষ দিক উন্মোচন করে। বক্তারা বলেন, ইসলামি ফিন্যান্সের প্রসারে কৌশলগত উদ্যোগ এবং সুশাসনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে নতুন মূল্য সংযোজন সম্ভব।
বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকিং খাত অতীতে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। এই সংকটগুলোতে উত্তরণের পথ ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার কৌশল নির্ধারণে এই সামিট বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ফাইন্যান্স সামিট আয়োজন করা হয়েছে। এতে তিনটি কিনোট স্পিচ এবং চারটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় শরিয়াহ গভর্নেন্স, সুকুক, ইসলামিক পুঁজি বাজার, ফিনটেক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ ও সমাধান নিয়ে গভীর এবং বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মানসুর। তিনি বলেন, “অ্যাওফির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার শরিয়াহ, অডিট এবং হিসাব–মানদণ্ড অনুসরণ ছাড়া সঠিক ইসলামি ব্যাংকিং পরিচালনা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে আমাদের খাতকে সংযুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে শুধু দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং বিশ্ববাজারে বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।”
সামিটে মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, বাহরাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ইসলামি ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞরাও অংশগ্রহণ করেন। তারা বলেন, বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামিক ফিন্যান্সের আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এই খাতের উন্নয়ন অর্থাৎ দেশীয় অর্থনীতিকে একটি নৈতিক, শরিয়াহ-সম্মত এবং কল্যাণমুখী দিক থেকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। বক্তারা আরও জোর দিয়ে বলেন, ইসলামিক ফাইন্যান্স শুধু সাধারণ আর্থিক কার্যক্রম নয়, এটি একটি নৈতিক, মানবিক এবং সামাজিক কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। তাই এই খাতের শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল উন্নয়ন দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সামিটে একটি বিশেষ ঘোষণা করা হয়। আইএফএ কনসালটেন্সি এবং আদল অ্যাডভাইজরি যৌথভাবে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রফেশনাল এক্সটার্নাল শরিয়াহ অডিট সার্ভিস প্রদান শুরু করবে। এই উদ্যোগের ফলে ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং শরিয়াহ সুশাসন আরও জোরদার হবে। এটি বাংলাদেশের ইসলামিক ফিন্যান্স খাতকে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কাঠামোর দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
সামিটে আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সুকুক এবং ইসলামিক পুঁজিবাজারের উন্নয়ন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সুকুক ইস্যু করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থিতিশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ বৃদ্ধি সম্ভব। তদুপরি, ইসলামিক পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও শরিয়াহ অনুসরণ করে লেনদেনের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
ফিনটেক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহারেও এই খাতকে শক্তিশালী করার দিকগুলো আলোচনায় উঠে আসে। বক্তারা বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও AI-ভিত্তিক সল্যুশন ব্যবহার করে ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সের কার্যক্রম আরও দক্ষ, স্বচ্ছ এবং গ্রাহকবান্ধব করা সম্ভব। এতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানের সাথে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে।
সামিটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শরিয়াহ মানদণ্ড ও অভিজ্ঞতা দেশীয় উদ্যোক্তা এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছেছে। এতে দেশের ইসলামিক ফিন্যান্স খাতকে একটি নতুন গতিশীলতা দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সংযোগ স্থাপনের পথও সুগম হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, সামিটের মাধ্যমে উদ্ভাবনী আইডিয়া, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তিগত সমাধান গ্রহণ করলে খাতটি আগামী বছরগুলোতে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের ইসলামিক ফিন্যান্স খাতকে বিশ্বমানের একটি নৈতিক আর্থিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করার এই পদক্ষেপ দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সামিটে আলোচনা ও সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ইসলামিক ফাইন্যান্স খাত শুধুমাত্র দক্ষিণ এশিয়ারই নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের যোগ্য একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
সংক্ষেপে, বাংলাদেশ ইসলামিক ফিন্যান্স সামিট–২০২৫ দেশের ইসলামিক ফিন্যান্স খাতের জন্য এক যুগান্তকারী আয়োজন হিসেবে চিহ্নিত হলো। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে খাতকে সংযুক্ত করতে, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নিশ্চিত করতে এবং প্রযুক্তি ও হিউম্যান ক্যাপিটাল উন্নয়নের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক ফাইন্যান্স ব্যবস্থা তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।










