রাতের ভোট বাস্তবায়নে শহীদুল আলম একাই ৫০ কোটি টাকা নেন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৮ বার
রাতের ভোট বাস্তবায়নে শহীদুল আলম একাই ৫০ কোটি টাকা নেন

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক যেন শেষ হতেই চায় না। ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স পূরণ, কেন্দ্রে কেন্দ্রে দলীয় লোকদের আধিপত্য, ভোটারদের প্রবেশে বাধা—এসব অভিযোগে নির্বাচনটি ‘রাতের ভোট’ নামে দেশ-বিদেশে পরিচিতি পায়। সময়ের পরিক্রমায় ঘটনাটি হয়ে উঠেছে একটি রাজনৈতিক অভিঘাতের প্রতীক, আর সেই অন্ধকার অধ্যায়ের অন্তরালে ভয়াবহ অঙ্কের টাকার গল্প ধীরে ধীরে সামনে আসতে শুরু করেছে।

সোশ্যাল মিডিয়া, দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোতে নতুন করে আলোচনায় আসছে সেই সময়ের গোপন অর্থ প্রবাহ, যাকে কেন্দ্র করে আঁকা হয়েছে বিশাল এক অন্ধকার নেটওয়ার্ক। অভিযোগ রয়েছে, তখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) নির্বাচনী ফলাফল নিয়ন্ত্রণ ও ভোট ডাকাতির উদ্দেশ্যে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গড়ে তোলে। নানা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, টেন্ডারবাণিজ্য এবং ভুয়া ঋণের মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ জোগাড় করা হয়েছিল বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে।

কিন্তু সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—এই বিপুল অঙ্কের টাকার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকাই শেষ পর্যন্ত চারজন প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পুলিশের বিশেষ শাখা—এসবির তৎকালীন অতিরিক্ত আইজি মীর শহীদুল ইসলাম, যিনি একাই ৫০ কোটি টাকা নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, ভোটের আগের রাতের ওই বিশেষ অভিযানে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। ঢাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ তার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে ছিল, আর সেই প্রভাবই তাকে এই বিশাল অঙ্কের টাকার প্রধান অংশীদারে পরিণত করে।

২০১৮ সালের সেই নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বুঝতে পারে—জনসমর্থন ছাড়া নির্বাচনে জয় পাওয়া কঠিন। তাই ‘রাতের ভোটের’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নই ছিল একমাত্র পথ। এই অভিযানের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে গোপনে কর্মকর্তাদের ‘পুরস্কার’ দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা, উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম এবং এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম মাসুদ—এই চারজনকে বিশাল তহবিল সংগ্রহ ও বিতরণের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে তদন্ত সূত্রের তথ্য। পরবর্তীতে এই তহবিলের বড় অংশ তাদের মধ্যেই বণ্টিত হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে কোটি কোটি টাকা হাতবদল হয়েছিল। দেশের একটি শীর্ষ তদন্ত সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা—যিনি গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় পরিচয় গোপন রাখেন—জানান, মোট আট হাজার কোটি টাকার মধ্যে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা সরাসরি ভোট ডাকাতির কাজে ব্যয় হয়। সারা দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার, আট রেঞ্জ ডিআইজি, আট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, র‌্যাবের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং দু’টি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা—সকলেই এই অর্থ বণ্টনের আওতায় ছিলেন। সরকারি বরাদ্দের তুলনায় এসব ইউনিট একেকটি ছয় থেকে সাতগুণ বেশি টাকা পেয়েছিল।

ভোটের আগের রাতে কোন ইউনিট কত টাকা পাবে, কীভাবে তা পৌঁছাবে—এসব পরিকল্পনার জন্য গড়ে ওঠে একটি গোপন নেটওয়ার্ক, যার নাম ছিল ‘অর্থ ডিস্ট্রিবিউশন টিম’। পুলিশের লিগ্যাল অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন সেল (এলআইসি) ইউনিটের কয়েকজন কর্মকর্তা এই টিমের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন। কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে টাকা পৌঁছানো হতো রেঞ্জ অফিস, জেলা পুলিশ, মেট্রোপলিটন ইউনিট এবং বিশেষায়িত বাহিনীগুলোর কাছে। প্রতিটি ব্যাগ, প্রতিটি পার্সেল, প্রতিটি লেনদেন ছিল কঠোর গোপনীয়তায় ঢেকে রাখা।

এই টিমে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন এআইজি আনজুমান কালাম, এসপি মীর আবু তৌহিদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইশতিয়াক উর রশিদ, দেবাশীষ দাস ও নূরে আলম। তাদের তত্ত্বাবধানে বিশেষ বাহক দল গঠিত হয়েছিল, যারা ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ওই রাতের গোপন অর্থ পৌঁছে দিতেন।

দলিলপত্রে দেখা যায়, শুধুমাত্র ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ—ডিএমপি—পেয়েছিল ৫০ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ—সিএমপি—১৫ কোটি, অন্যান্য মেট্রোপলিটন ইউনিটকে দেওয়া হয় সাত কোটি টাকা করে। পুলিশ সদর দপ্তরের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা পেয়েছিলেন ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত। র‌্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ র‌্যাবের নামে ১০০ কোটি টাকা নিয়েছিলেন বলে উল্লেখ আছে।

এসব বিতরণের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে নজরে আসে—তৎকালীন এসবি অতিরিক্ত আইজি মীর শহীদুল ইসলামের জন্য বরাদ্দ ছিল ৫০ কোটি টাকা। অভিযোগ আছে, শুধু ভোটের রাতে মাঠপর্যায়ে ‘বিশেষ কাজ’ নয়, পুরো নির্বাচন পূর্ববর্তী পর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ তৈরির দায়িত্বও তার ওপরই অর্পিত ছিল। ফলে তিনি হয়ে ওঠেন ক্ষমতার বলয়ে সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একজন।

বিভাগীয় প্রশাসন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের দায়িত্বশীল কিছু কর্মকর্তাও এনিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা মনে করেন—এই তহবিল বণ্টনের মাধ্যমে শুধু নির্বাচন নয়, রাষ্ট্রের মূল নৈতিক কাঠামোকেই আঘাত করা হয়েছিল। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। এই ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনও দেশ বহন করছে।

অর্থ পরিবহনের কাজে যুক্ত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব হারুন-অর-রশিদ বিশ্বাস, উপসচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস, ডিআইজি হাবিবুর রহমান, সিটিটিসির প্রাক্তন ডিসি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান এবং সাবেক এসপি মিলন মাহমুদ। তারা প্রত্যেকে নির্দিষ্ট এলাকায় ও ইউনিটে টাকা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন বলে অভিযোগ।

যারা তখন ভোটের অধিকার হারিয়েছিলেন, যারা কেন্দ্রে গিয়ে ফিরে এসেছিলেন, কিংবা যারা টেলিভিশনের পর্দায় রাতারাতি আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার দৃশ্য দেখেছিলেন—তাদের অনেকেই আজও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মানুষের সেই বঞ্চনার রাতের পেছনে যে কত অঙ্কের টাকার লেনদেন হয়েছিল, তার খণ্ডচিত্র এখন সামনে আসছে।

অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—এত বিশাল অঙ্কের টাকা কোথায় গেল? এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচার কি হবে? যারা গণতন্ত্রের মূল্যবোধকে ধ্বংস করেছিল, তারা কি কখনো জবাবদিহির মুখোমুখি হবে?

দেশ এখনো উত্তরের অপেক্ষায়। তবে একটাই সত্য—২০১৮ সালের সেই রাতের নির্বাচনের অন্ধকার অধ্যায় নতুন দলিল, নতুন তথ্য আর নতুন স্বীকারোক্তিতে প্রতিদিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত