অবৈধ সম্পদ তদন্তে মহীউদ্দীন দম্পতির ৩৩ ব্যাংক হিসাব স্থগিত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪১ বার
অবৈধ সম্পদ তদন্তে মহীউদ্দীন দম্পতির ৩৩ ব্যাংক হিসাব স্থগিত

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সাবেক আমলা এবং ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও তার স্ত্রী সিতারা আলমগীরের নামে থাকা ৩৩টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পর মঙ্গলবার ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজ এ আদেশ দেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তকে চলমান দুর্নীতি দমন কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান মিরাজ আদালতে যে আবেদন করেন সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়, আসামিরা তাদের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন করে অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারেন—এমন আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া পাওয়া গেছে তথ্য যে, ওই হিসাবগুলো ব্যবহার করে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ পাচারের সম্ভাবনাও রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাই হিসাবগুলো অবরুদ্ধ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংকগুলোকে হিসাব স্থগিতের নির্দেশ দেন।

যে ৩৩টি হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলো দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা ব্যক্তিগত ও স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে খোলা ছিল। দুদকের আবেদনে জানানো হয়, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যাংকে বিশাল অঙ্কের টাকা লেনদেন করেছেন যার অনেকটিরই বৈধ উৎস মেলেনি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মুদ্রায় অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে এসব হিসাবে।

দুদকের মামলার তথ্য অনুসারে, মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও তার স্ত্রী সিতারা আলমগীর ঘুস ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা করেন। এ সময় পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক), আইএফআইসি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংকসহ আরও বেশ কিছু ব্যাংকে মোট ৭৯টি অ্যাকাউন্টে ২১৬ কোটি ১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা এবং ৬,১৮৮.৫৯ মার্কিন ডলার জমা হয়। একই সময় উত্তোলন করা হয় ২০৯ কোটি ১৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ও ৬,০০০.০২ মার্কিন ডলার। এই অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে না পারায় দুদক বিষয়টিকে মানিলন্ডারিংয়ের স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে দেখছে।

মামলাটির তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, লেনদেনের ধরন, সময় এবং পরিমাণ দেখে স্পষ্ট যে অর্থগুলো স্থানান্তর, রূপান্তর এবং ধাপে ধাপে জমা–উত্তোলনের মধ্য দিয়ে এদের উৎস গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ কারণে তদন্তে এখন হিসাবগুলোর ব্যবহার, জমা হওয়া অর্থের উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা—সবকিছুই গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, শুধু হিসাব স্থগিতই নয়—তদন্তের প্রয়োজনে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে লেনদেনের নথির সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণসহ নানা দিকই বিশদভাবে খতিয়ে দেখা হবে। অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি রাখা হবে না। তিনি আরও বলেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত তদন্তকে আরও বেগবান করবে।

মহীউদ্দীন খান আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে দীর্ঘদিন জড়িত একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাই তার বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব স্থগিত হওয়ার ঘটনা জনমনে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে নানামুখী প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং দুর্নীতি রোধে এটি একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

এদিকে, অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারির পর থেকেই ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এবার আদালতের নির্দেশে এমন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ হওয়া সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

দুদকের করা মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়, আসামিরা শুধু নিজেদের নয়, বরং নিকটাত্মীয় ও বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ লেনদেন করেছেন। ফলে তদন্তে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হতে পারে। তদন্তে কোনো পর্যায়ে যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে এসব ব্যক্তিরা ইচ্ছাকৃতভাবে অবৈধ অর্থ লেনদেনে সহায়তা করেছেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ঘটনার সময় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হতে পারে। তারা মনে করছেন, সম্পদগুলো বৈধ আয় থেকেই এসেছে এবং দুর্নীতির অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। তবে তদন্ত সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এসব দাবি পর্যালোচনা করার সুযোগ নেই বলে জানান দুদকের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশে গত এক দশকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান বাড়লেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে গিয়ে অনেক সময় নানা জটিলতা তৈরি হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দুদকের তৎপরতা বেড়েছে। এই মামলাকে তাই অনেকে একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন। তদন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে দেশের আর্থিক খাতে দুর্নীতি দমনে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে তারা মনে করেন।

যে সমাজে দুর্নীতি বারবার উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেই সমাজেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের দৃঢ় পদক্ষেপ মানুষের আস্থা বাড়ায়। মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝেও এমন প্রত্যাশা দেখা যাচ্ছে যে, তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত হবে। দেশের সাধারণ মানুষ মনে করছেন, ব্যক্তি পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব নয়—অপরাধই হবে বিচারিক সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি। তাদের বিশ্বাস, আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয়, তাহলে দেশের আর্থিক স্বচ্ছতা ও সুশাসন জোরদার হবে।

তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে এখন সবারই নজর দুদকের দিকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের নির্দেশে অবরুদ্ধ হিসাবগুলো এখন তদন্তকে আরও গতিশীল করবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ দমনেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এখন অপেক্ষার বিষয়, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এটি বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হতে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত