ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শান্তিপূর্ণে সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগিতা চান প্রধান উপদেষ্টা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪২ বার
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শান্তিপূর্ণে সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগিতা চান প্রধান উপদেষ্টা

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যেই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করেছে। দেশজুড়ে বিভিন্ন মহলে নির্বাচনী প্রস্তুতির আলোচনা বাড়ছে, আর সেই প্রেক্ষাপটে নির্বিঘ্ন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন আয়োজনে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিশ্রুতিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বুধবার মিরপুরের সামরিক বাহিনীর কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে এক অনুষ্ঠানে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণ, আনন্দময় ও মানুষের অংশগ্রহণে ভরপুর হয়, সে জন্য সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, সেখানে নিরপেক্ষতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতি ও পেশাদারিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে এই প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত স্পষ্টভাবে উঠে আসে।

মিরপুরে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আরও কথা বলেন। তিনি জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের সময়কার ঘটনাবলি স্মরণ করে বলেন, সামরিক বাহিনী তখন সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা দেশকে একটি বড় ধরনের অরাজকতা থেকে রক্ষা করেছিল। তার মতে, সেনাবাহিনী শুধু বলপ্রয়োগকারী কোনো শক্তি নয়; বরং রাষ্ট্রের সংকটময় মুহূর্তে একটি স্থিতিশীল শক্তি, যার দায়িত্বশীলতার উপর অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করে দেশের ভবিষ্যৎ।

এ সময় ডিএসসিএসসি—কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের অর্জন নিয়েও প্রশংসা করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাপী যে সম্মান অর্জন করেছে, তা শুধু সামরিক বাহিনীর জন্য গর্বের নয়; দেশের জন্যও একটি বড় অর্জন। সামরিক জ্ঞান, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব এবং মানবিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে তৈরি এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আরও সক্ষম করে তুলছে।

অনুষ্ঠানে এবার ৫৮ জন বিদেশি অফিসারসহ ৩১১ জন প্রশিক্ষণার্থী গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে আসা তরুণ অফিসারদের এই সমন্বিত প্রশিক্ষণ শুধু সামরিক দক্ষতাই বাড়ায় না, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়াও গভীর করে। ড. ইউনূস তরুণ অফিসারদের উদ্দেশে বলেন, অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে দেশ, জাতি এবং মানবতার কল্যাণে কাজে লাগানোই একজন পেশাদার সামরিক কর্মকর্তার প্রকৃত দায়িত্ব।

তিনি আরও বলেন, দেশের সামরিক বাহিনী সবসময়ই সংকটকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভবিষ্যতেও তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। কারণ একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য, আর এর মাধ্যমে গড়ে ওঠে জনগণের আস্থা। জনগণের সেই আস্থা যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর সতর্কতা, পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সভায় উপস্থিত ছিলেন সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের একটি বাড়তি মাত্রা এনে দেয়। সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার এই প্রত্যক্ষ যোগাযোগও নির্বাচনের আগে শক্তিশালী বার্তা দেয় যে, সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামরিক বাহিনীকে পাশে রাখার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ কাজ নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী উত্তাপ, রাজনৈতিক সমাবেশ, রাস্তাঘাটে সংঘর্ষের আশঙ্কা এবং সামাজিক মাধ্যমে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঠিক এমন সময়ে প্রধান উপদেষ্টার এই আহ্বান জনগণকে আশ্বস্ত করার পাশাপাশি নির্বাচনের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থাও বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশে নির্বাচন মানে এক ধরনের সামাজিক উৎসব। গ্রামে-গঞ্জে, শহরে সবাই মিলেমিশে ভোট দিতে যাওয়ার স্মৃতি দেশটির গণতান্ত্রিক চেতনার অংশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচনী সহিংসতা, অনিয়ম, ভোটকেন্দ্র দখল এবং নির্বাচনের প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহা রাজনৈতিক পরিবেশকে জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করতে পারে। তিনি যে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কথা বলেছেন, তা বাস্তবে রূপ দিতে সশস্ত্র বাহিনীসহ প্রশাসনের বিভিন্ন অঙ্গের সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন হবে।

অনুষ্ঠান শেষে সামরিক কর্মকর্তা ও অতিথিদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেন প্রধান উপদেষ্টা। আলোচনায় উঠে আসে দেশের উন্নয়ন, বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকা এবং ভবিষ্যতে সশস্ত্র বাহিনীর করণীয়।

নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, জনগণের প্রত্যাশা ততই বাড়ছে। শান্তিপূর্ণ ভোট, নিরপেক্ষ প্রশাসন, শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি প্রতিদিনই জোরালো হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টার সাম্প্রতিক বক্তব্য হয়তো সেই প্রত্যাশার একটি প্রতিফলন, যা দেশের মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করবে—এই নির্বাচন কি সত্যিই হতে যাচ্ছে একটি উৎসব, নাকি আবারও উত্তেজনা, সংঘর্ষ আর বিভাজনের পথে হাঁটবে জাতি।

সামনের দিনগুলোই বলে দেবে কতটা সফল হবে প্রধান উপদেষ্টার এই উদ্যোগ। তবে আপাতত তার আহ্বান দেশের রাজনৈতিক আকাশে একটি শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে—যা হয়তো ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে জন্ম দেবে একটি নতুন আস্থার পরিবেশ, একটি নতুন প্রত্যাশার আলো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত