শীতে বাড়ে মানসিক চাপ, ঝুঁকিতে সব বয়সের মানুষ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৩ বার
শীতে বাড়ে মানসিক চাপ, ঝুঁকিতে সব বয়সের মানুষ

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শীতের হাওয়া নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির মতো মানুষের মনেও পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বছরের শেষভাগে আবহাওয়া বদলে গেলে পরিবেশ যেমন শীতল আর নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, তেমনি অনেকের অন্তর্জগতেও শুরু হয় চাপা অস্থিরতা, অনিচ্ছা, ক্লান্তি ও মন খারাপের অনুভূতি। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে—শীতকাল শুধু জ্বর-সর্দি বা ফ্লুর মতো শারীরিক অসুস্থতা বাড়ায় না, এতে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে দিন ছোট হওয়া, সূর্যালোক কম পাওয়া, ঠান্ডা ও নিস্তব্ধ পরিবেশ মানুষের মন-মেজাজে প্রভাব ফেলে। এ কারণে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, একাকিত্ববোধ এমনকি আত্মবিশ্বাস হ্রাসের মতো মানসিক লক্ষণও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে শীতকাল ছোট হলেও পরিবেশগত পরিবর্তন তীব্রভাবে অনুভূত হয়, সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি দ্রুত দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, মানুষ শীতকালে স্বাভাবিকের তুলনায় কম সক্রিয় হয়ে পড়ে। দিনের আলো কম থাকায় শরীরে সার্কাডিয়ান রিদম বা জীবজৈবিক ঘড়ির পরিবর্তন দেখা দেয়। এতে ঘুমের ধরন বদলে যায়, শরীরে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিকের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এর ফলেই মানুষ সহজেই খিটখিটে, ক্লান্ত বা দুঃখবোধে আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে যাদের মানসিকভাবে আগে থেকেই দুর্বলতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে শীতের প্রভাব আরও বেশি তীব্র হয়।

বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন জরিপে যা উঠে এসেছে তা সত্যিই উদ্বেগজনক। দেশে প্রতি আটজনের একজন কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন, যা সংখ্যায় লাখো মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মানসিক রোগের হার প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, আর শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে তা ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ চিকিৎসা সেবা নেন, বাকিরা কোনো চিকিৎসাই পান না। নারীরা এই অসুস্থতায় বেশি ভুগলেও পুরুষদের মধ্যে সামাজিক সংকোচ, কুসংস্কার বা অপমানিত হওয়ার ভয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা অত্যন্ত কম। কিশোরদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ—তাদের মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ মানসিক চিকিৎসার আওতায় আসে।

বিশ্বব্যাপীও মানসিক স্বাস্থ্য এখন বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৯৭ কোটি মানুষ সরাসরি মানসিক রোগ বা মাদকাসক্তির সমস্যায় ভুগছেন। মানসিক রোগের এই ব্যাপক বিস্তার শুধু ব্যক্তিগত জীবনই নয়, সামাজিক কাঠামো ও জাতীয় উৎপাদনশীলতাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কোটি মানুষের জীবনের মান কমে যাচ্ছে, কর্মশক্তি ভেঙে পড়ছে এবং সম্পর্কগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই; বরং এটি এখন জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, মানসিক রোগ হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এটি দীর্ঘমেয়াদি, জটিল এবং বহুস্তরীয় কারণের সম্মিলিত ফল। পরিবারে মানসিক রোগের ইতিহাস থাকলে তা পরবর্তী প্রজন্মেও ঝুঁকি তৈরি করে। এটিকে জেনেটিক বা উত্তরাধিকারী কারণ বলা হয়। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক রোগ—যেমন হৃদরোগ, ক্যানসার, বা হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগলে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও চাপ পড়ে। নিয়মিত অসুস্থ থাকা বা শরীরের ব্যথা, কষ্ট ও দূর্বলতা মানসিক শক্তিকে দুর্বল করে ফেলে, ফলে রোগী সহজেই হতাশা বা উদ্বেগে আক্রান্ত হতে পারেন।

মাদকাসক্তি মানসিক অসুস্থতার অন্যতম বড় কারণ। অ্যালকোহল, ইয়াবা, গাঁজা, আইস—এসব মাদক মস্তিষ্কের স্বাভাবিক রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে। এতে আচরণগত পরিবর্তন, হ্যালুসিনেশন, উদ্ভ্রান্ত আচরণসহ নানা গুরুতর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে পারিবারিক ট্রমা ও সহিংসতা মানসিক সুস্থতা নষ্ট করে। ছোটবেলায় শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, পরিবারে ঝগড়া-বিবাদ, বিচ্ছেদ, অর্থনৈতিক চাপ—এসব দীর্ঘমেয়াদে গভীর মানসিক সমস্যা তৈরি করে। মস্তিষ্কে আঘাত লাগা বা দুর্ঘটনার পর পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেসও অনেকসময় স্থায়ীভাবে মানসিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে।

আমাদের ব্যস্ত শহুরে জীবনে ঘুমের অভাব এবং ক্রনিক স্ট্রেস যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিক কাজের চাপ, আর্থিক উদ্বেগ, সামাজিক প্রতিযোগিতা এবং জীবনযাত্রার দ্রুতগতি মানুষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। পর্যাপ্ত ঘুম না পেলে মস্তিষ্কের বিশ্রাম হয় না, ফলে উদ্বেগ, ভুলোমন, সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দেখা দিতে পারে। দ্রুত প্রতিদিনকার চাপ জমতে থাকলে মানুষ ধীরে ধীরে বিষণ্ণতা বা উদ্বেগজনিত রোগে আক্রান্ত হয়।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মানসিক রোগকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেন—নিউরোসিস এবং সাইকোসিস। নিউরোসিস সাধারণত তুলনামূলক হালকা ধরনের মানসিক সমস্যা, যেখানে ব্যক্তি বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা হারান না। রোগী উদ্বেগ, উদ্বিগ্নতা, জেদ, অতিরিক্ত চিন্তা বা বিষণ্ণতায় ভুগতে পারে, কিন্তু তাঁর সামাজিক জীবন ও আচরণ সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। সঠিক চিকিৎসা পেলে এই ধরণের রোগ দ্রুত ভালো হয়ে যায়। অন্যদিকে সাইকোসিস গুরুতর মানসিক অসুস্থতা, যেখানে রোগী বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ম্যানিয়া বা গভীর বিষণ্ণতা সাইকোসিসের অন্তর্গত। এ অবস্থায় রোগীর আচরণ অপ্রত্যাশিত বা বিপজ্জনক হতে পারে, ফলে চিকিৎসা ও পরিবারের বিশেষ যত্ন প্রয়োজন হয়।

শীতকালে এসব সমস্যার প্রকোপ বাড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। গ্রামে যেমন শীতকালে মানুষজন বাড়িতে বেশি সময় কাটায়, শহরেও মানুষ বাইরে কম বের হয়, আড্ডা কম দেয়। ফলে একাকিত্ব বাড়ে এবং মন-মেজাজ খারাপের প্রবণতা দেখা দেয়। বিভিন্ন বয়সে এর প্রভাব ভিন্নভাবে দেখা দেয়। বয়স্করা এ সময় জোড়-ব্যথা, সর্দি-কাশি বা দুর্বলতায় ভুগে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। যুবসমাজ চাকরি ও শিক্ষাজনিত চাপের কারণে শীতে আরও বেশি স্ট্রেসে আক্রান্ত হন। কিশোরদের ক্ষেত্রে স্কুলের পড়া, পারিবারিক চাপ ও সামাজিক যোগাযোগের জটিলতা মানসিক দ্বন্দ্ব বাড়ায়। নারীরা শীতে হরমোনগত ওঠানামার কারণে বিষণ্ণতা বা উদ্বেগে বেশি ভোগেন।

শীতকাল তাই আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক অদৃশ্য চাপের সময়। এই সময়ে শারীরিক যত্নের পাশাপাশি মানসিক যত্নও অপরিহার্য। বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিয়মিত রোদে হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য, ব্যায়াম, পরিবার-বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটানো, সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মতো ছোট ছোট পরিবর্তন মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। সবচেয়ে জরুরি হলো—মানসিক অসুস্থতাকে লজ্জা বা দুর্বলতা হিসেবে না দেখে এটিকে স্বাভাবিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা।

শীতের এই পরিবর্তনশীল পরিবেশে দেশের মানুষকে সচেতনতা বাড়াতে হবে, কারণ মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা মানে শুধুই ব্যক্তিগত সুস্থতা নয়, একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নও। মানসিকভাবে সুস্থ মানুষই পারে সমাজকে এগিয়ে নিতে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব নিয়ে আজই শুরু হোক নতুন ভাবনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত