প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার দিন রাজধানীর ধানমণ্ডিতে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, সেই মুহূর্তে পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও তীব্র বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া। ঘটনাস্থলের ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, আর ঠিক তখন থেকেই শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা, বিতর্ক এবং বিদ্রূপ। অনেকেই তাকে উদ্দেশ্য করে কঠোর ভাষায় বিরূপ মন্তব্য করতে থাকেন, যেন এক তরুণীর প্রতিবাদী অবস্থানকে ঘিরে তৈরি হয় এক নতুন সামাজিক প্রপঞ্চ।
রায় ঘোষণার দিনটির পরিবেশ ছিল অধিক উত্তেজনাপূর্ণ। মামলার রায়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মিডিয়া কর্মীদের ভিড় জমে ধানমণ্ডিতে। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রগুলো জানায়, পরিস্থিতি দ্রুতই উত্তেজনা থেকে সংঘর্ষের দিকে গড়ায়। এ সময় ডাকসুর সদস্য রাফিয়া পুলিশের বাধার মুখে প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করলে তা রূপ নেয় সরাসরি বাকবিতণ্ডায়। ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের কঠোর আচরণে তিনি দমে যাননি; বরং সরাসরি প্রতিবাদ করে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেন। অথচ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর অনলাইনে তাকে লক্ষ্য করে শুরু হয় একধরনের কটাক্ষ, অপমান, গায়ের জোরে ‘নৈতিকতা’ বোঝানোর প্রতিযোগিতা।
ঠিক এই মুহূর্তে রাফিয়ার পাশে এসে দাঁড়ালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ও আলোচিত শিক্ষিকা শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামি। মঙ্গলবার রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি দীর্ঘ পোস্টে তিনি শুধুই রাফিয়াকে সমর্থন করেননি, বরং দেশের সামাজিক মনোভাব, নারীর অবস্থান এবং ফেমিনিজম নিয়ে এক তীক্ষ্ণ ও শক্তিশালী প্রশ্নও ছুড়ে দিয়েছেন।
মোনামি পোস্টে লেখেন, রাফিয়াকে এভাবে টার্গেট করার মূল কারণ তার প্রতিবাদী অবস্থান নয়; বরং সে নিজের ধর্মীয় পরিচয়কে দৃশ্যমানভাবে ধারণ করে। তার দাবি, যদি একই পরিস্থিতিতে হিজাব ছাড়া কোনো তরুণী এমন সাহস দেখাতেন, তাহলে তাকে ‘আধুনিক’, ‘সাহসী’, ‘ক্ষমতায়িত নারী’-র তকমা দিতে অনেকেই এগিয়ে আসতেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের পরিচিত ফরম্যাট যেন এখনো সীমাবদ্ধ কিছু নির্দিষ্ট বাহ্যিকতা ও মতাদর্শে। সেটি থেকে বিচ্যুত হলেই সমালোচনার তীর ছুটে আসে অবলীলায়।
শিক্ষিকা মোনামির মতে, পুলিশের আচরণ ছিল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহৃত ভাষা, অঙ্গভঙ্গি ও মনোভাবের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন পুলিশের এমন আচরণকে কেউ ‘নির্যাতনমূলক’ বা ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ হিসেবে স্বীকার করছেন না, অথচ রাফিয়ার প্রতিবাদী অবস্থানকেই কটাক্ষ করা হচ্ছে বারবার। তার ভাষায়, এই বৈষম্যের মূলে রয়েছে সমাজের এক ধরনের পক্ষপাত, যা ধর্মীয় পরিচয় দৃশ্যমান এমন নারীকে প্রতিবাদের মঞ্চে স্বাচ্ছন্দ্য দেয় না।
মোনামির পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। অনেকেই তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে মন্তব্য করেছেন, একাংশতার কারণে নারীর সাহসিকতা মূল্যায়নে একটি দ্বৈত মানদণ্ড কাজ করছে। কেউ কেউ মনে করেন, বর্তমান সমাজব্যবস্থায় নারীর জন্য ‘স্বীকৃত’ বা ‘প্রশংসনীয়’ প্রতিবাদের ধরন একপেশে হয়ে গেছে। যে প্রতিবাদ আধুনিকতার প্রচলিত কাঠামোর বাইরে অবস্থান করে, তাকে সমালোচিত ও অপমানিত হতে হয় বেশি। রাফিয়ার ক্ষেত্রেও সেই ধারা স্পষ্ট।
অন্যদিকে, সমালোচকদের একটি অংশ এখনো রাফিয়ার আচরণকে ‘উচ্চস্বরে কথা বলা’, ‘প্ররোচনামূলক’ বা ‘অসম্মানজনক’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তাদের যুক্তি, পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ানো উচিত হয়নি। তবে মোনামি ও তার সমর্থকদের মতে, সেখানে প্রশ্নটি আচরণগত নয়, বরং ক্ষমতার একটি অবস্থানিক বৈষম্য। একজন তরুণীর ওপর যে আচরণটি পেশ করা হয়েছিল, তা কারো ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়—সেটি স্বীকার করতেই অনেকের অনীহা।
ঘটনার সূত্রপাত ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সমাজে যে ধরণের মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন তৈরি করেছে, তা বিশেষজ্ঞদের মতে উদ্বেগজনক। তারা বলছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক উত্তাপ, নারীর সামাজিক অবস্থান এবং অনলাইন ট্রল সংস্কৃতি মিলেমিশে এমন পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে যেকোনো প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর সহজেই হয়ে উঠছে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। বিশেষ করে নারী হলে সে আক্রমণ আরও ব্যক্তিগত, আরও নির্মম রূপ নেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রাফিয়াকে নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ বলছেন, একজন ডাকসু সদস্য হিসেবে তাকে আরও ধীরস্থির থাকা উচিত ছিল। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, তার অবস্থান ছিল ন্যায়সংগত এবং একজন তরুণী হিসেবে এমন পরিস্থিতিতেও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়াই তার সাহসের পরিচয়।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে নারীর স্বাধীনতা, প্রতিবাদের অধিকার এবং সামাজিক বিচার। রাফিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে মোনামি যেভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন, তা নিছক ব্যক্তিগত সমর্থন নয়; বরং সমাজের বহুস্তরীয় মানসিকতার প্রতি এক গভীর প্রশ্ন। তার মতে, নারীর ক্ষমতায়ন শুধুই পোশাক, স্টাইল বা নির্দিষ্ট মতাদর্শ নির্ভর হওয়া উচিত নয়। বরং একজন নারী কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজের অধিকার রক্ষা করতে দাঁড়াচ্ছেন, সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের মূল ভিত্তি।
ইতোমধ্যে রাফিয়াও সমর্থন পেয়েছেন অনেক নারী অধিকারকর্মীর। তারা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর বিরুদ্ধে যে হারে সমালোচনা ও কটূক্তি চালানো হয়েছে, তা মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক সহিংসতা, যা নারীকে অনলাইন-অফলাইন দুই ক্ষেত্রেই ভীত করার অঘোষিত কৌশল।
ঘটনার প্রেক্ষাপটে এখনো পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে। তারা বলছে, পুলিশ ও জনগণের সম্পর্ক আস্থার ভিত্তিতে গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
শেষ পর্যন্ত রাফিয়ার এই ঘটনাটি শুধু একটি বাকবিতণ্ডার ভিডিও নয়, বরং বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে নারীর দৃশ্যমানতা, প্রতিবাদের ভাষা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ডকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। আর মোনামির সমর্থন সেই আলোচনাকে আরও তীব্র ও স্পষ্ট করে তুলেছে। কারণ, তিনি প্রশ্ন তুলেছেন শুধু রাফিয়াকে কেন আক্রমণ করা হলো, তার প্রতিবাদী অবস্থানকে কেন ছোট করা হলো—এটিই নয়। প্রশ্নটি আরও বড়: দেশে নারীর প্রতিবাদ ঠিক কোন ‘চেহারায়’ গ্রহণযোগ্য এবং কোন চেহারায় বিতর্কিত?
সমাজ যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা পেরিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি, তখন এমন প্রশ্নগুলোই হয়তো সামনে এগোনোর পথ তৈরি করবে। রাফিয়া এবং মোনামি—দুজনের অবস্থান এক্ষেত্রে নারীর স্বাধীন অভিব্যক্তির সংগ্রামে নতুন এক অধ্যায় খুলে দিচ্ছে, যেখানে সাহস ও সত্য বলার অধিকারই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় শক্তি।