জবিতে জকসু নির্বাচনে শিবিরের প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৬ বার
জবিতে জকসু নির্বাচনে শিবিরের প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন জগন্নাথ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—জকসু—নির্বাচনের প্রস্তুতি ত্বরান্বিত হচ্ছে, ঠিক তখনই প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করল ইসলামী ছাত্রশিবির। সংগঠনটির নেতারা দাবি করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, একাডেমিক সুষ্ঠু পরিবেশ প্রতিষ্ঠা এবং ক্যাম্পাসকে রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে মুক্ত রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য। প্যানেল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বৈচিত্র্যময় প্রতিক্রিয়া, যা নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি ও নির্বাচনী পদ্ধতির স্বচ্ছতা।

মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিবিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জবি শিবির সভাপতি রিয়াজুল ইসলামকে ভিপি পদে মনোনীত করা হয়েছে। তার পাশে জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ। সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চে ছিলেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা, যাদের অনেকেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ববর্তী আন্দোলন, বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের উত্তাল ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময় সংঘটিত মানবিক ও একাডেমিক সংকট মোকাবিলারও নেতৃত্বে।

ঘোষণার সময় ভিপিপ্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে হলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, প্রার্থীরা যেন স্বাধীনভাবে প্রচার চালাতে পারেন, আর নির্বাচন যেন সত্যিকার অর্থেই গণতান্ত্রিক পরিবেশে সম্পন্ন হয়—এমন প্রত্যাশা নিয়েই তিনি প্রার্থী হয়েছেন। তার বক্তব্যে ছিল সংগঠনের দীর্ঘদিনের অভিযোগও। তিনি জানান, বিগত সময়ে শিবিরের শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের হয়রানি ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, তবে জকসু নির্বাচন তাদের জন্য নিজেদের অবস্থান জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

সংবাদ সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক ও জিএস পদপ্রার্থী আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, বৈষম্যমুক্ত ও গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস গড়ে তোলাই হবে তাদের প্রধান কাজ। তিনি দাবি করেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত যে হয়রানি, সেশনজট, ক্লাসরুম সংকট এবং পরিবহন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেগুলো সমাধানে তাদের প্যানেল বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, জকসু যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

প্যানেলের অন্যান্য পদেও মনোনীত হয়েছেন বিভিন্ন বিভাগ ও বর্ষের সক্রিয় শিক্ষার্থীরা, যারা ইতোমধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, মানবাধিকার, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ক্রীড়ামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কল্যাণমূলক কাজে যুক্ত থাকায় তাদের নির্বাচন নতুন করে এক যৌক্তিক প্রতিযোগিতা তৈরি করছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।

ঘোষিত প্যানেলে যাদের নাম এসেছে, তাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন সময় একাডেমিক ও সাংগঠনিক কাজের মাধ্যমে নিজেদের পরিচিতি তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। যেমন সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনীত মাসুদ রানা তার একাডেমিক গবেষণায় সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে আলোচিত। নুরনবী মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র চর্চা, ইব্রাহিম খলিল শিক্ষা-গবেষণা, সুখীমন বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, নুর মোহাম্মদ স্বাস্থ্য-পরিবেশ এবং আবির মোহাম্মদ ফারুক মানবাধিকার বিষয়ে বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আলোচনা ও আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আবার সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পাদক পদে মনোনীত নাহিদ হাসান রাসেল ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। এই বিস্তৃত তালিকাটি দেখে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বলছেন, দলটি প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিলেও প্যানেল গঠন করতে তারা যথেষ্ট গুরুত্ব ও সময় ব্যয় করেছে।

প্যানেলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে নওশিন জয়া এবং ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে জরজিস আলমকে মনোনীত করা হয়েছে। তাদের নাম ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে। পরিবহন সমস্যা দীর্ঘদিনের হওয়ায় পরিবহন সম্পাদক পদে তাওহিদুল ইসলামের মনোনয়ন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশেষ প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে। তারাই আশা করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের পরিবহন সংকট অবসানে তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।

এছাড়া সমাজসেবা ও শিক্ষার্থীকল্যাণ সম্পাদক হিসেবে মোস্তাফিজুর রহমান, পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক হিসেবে সোহাগ আহমেদ এবং সাতটি নির্বাহী সদস্য পদে আক্তার, সালেহ মহসিন সিয়াম, ফাতেমা আক্তার অওরিন, আকিব হাসান, কাজী আরিফ, মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ও আব্দুল্লাহ আল ফারুককে মনোনীত করা হয়েছে। এই সদস্যরা ক্যাম্পাসভিত্তিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকায় অনেকেই তাদের নির্বাচনকে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিবির নেতারা বলেন, তাদের প্যানেল সম্পূর্ণভাবে নির্বাচনমুখী এবং তারা বিশ্বাস করেন, একাডেমিক পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় জকসুর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বৈধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে শিক্ষার্থীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন। তারা এটিও দাবি করেন যে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয়কে ঘিরে কোনো ধরনের হয়রানি বা বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হলে তারা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিবিরের প্যানেল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী বড় ছাত্রসংগঠনগুলোর বাইরে নতুন শক্তির উত্থান নির্বাচনে প্রতিযোগিতা বাড়াবে। আবার কিছু শিক্ষার্থী শঙ্কা প্রকাশ করছেন, আদর্শগত বিরোধ থেকে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই মনে করছেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা সকল সংগঠনের অধিকার, এবং সেই অধিকারই প্রতিষ্ঠানকে পরিপূর্ণতা দেয়।

জকসু নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সব পক্ষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে তারা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ভোটগ্রহণ, প্রচারণা, পোস্টারিং, প্রার্থীদের নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই তারা নিরপেক্ষতা বজায় রাখবেন। তাদের প্রত্যাশা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করবেন।

সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে অনেক আশা-নিরাশার মাঝেই শিবিরের প্যানেল ঘোষণা এসেছে। প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশগ্রহণের এই সিদ্ধান্তকে অনেকে সংগঠনের রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। সামনে প্রচারণা শুরু হলে প্যানেলের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও স্পষ্ট হবে। তবে একথা পরিষ্কার, জকসু নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তাপ বাড়ছে ক্যাম্পাসে। শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছেন—কোন নেতৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, আর কোন প্যানেল শিক্ষার্থীদের অধিকারের সত্যিকারের প্রতিফলন ঘটাতে পারবে।

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই হয়তো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা দেখতে পাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত