বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে তৃণমূলে অস্থিরতা বাড়ছে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪০ বার
বিএনপি আরও ৫৫ নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা দলটির ভেতরে অস্থিরতা ও বিভক্তি আরও তীব্র করে তুলেছে। সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানাচ্ছেন। কোথাও বিক্ষোভ, কোথাও সংঘর্ষ এবং কোথাও শোকাবহ পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে এই ক্ষোভ ও হতাশা যত দ্রুত ছড়াচ্ছে, ততই প্রশ্ন উঠছে—বিএনপি কি এই ভাঙন সামলে নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ মুখ দেখাতে পারবে?

নেতৃত্ব পর্যায় অবশ্য বলছে, প্রাথমিক তালিকা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন বলছেন, মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ প্রতিটি নির্বাচনী মৌসুমেই দেখা যায়। একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকলে একজনকে বেছে নেওয়ার কারণেই এই অসন্তোষ তৈরি হয়। তার দাবি, বিএনপির ভেতরের মতপার্থক্য নির্বাচনের ফলাফলকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করবে না। একই সুরে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন, এটি কেবল সম্ভাব্য তালিকা এবং দলের মহাসচিব বা প্রার্থী筛নের পর্যায়ে যে কোনো সময় পরিবর্তন আসতে পারে।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরছে। তালিকা ঘোষণার দিন থেকেই একাধিক আসনে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। ময়মনসিংহ-৩ আসনে মনোনয়ন বঞ্চিতদের আন্দোলনের সময় সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন উত্তর জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি তানজিল আহমেদ মিঠু। এমন মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ সংশ্লিষ্ট এলাকায় অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ আরও প্রকট। চট্টগ্রাম-৪ আসনে সালাউদ্দিনকে সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করার পর থেকেই দলের ভেতরে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে। স্থানীয় BNP নেতাদের দাবি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরীর বিকল্প কেউ হতে পারে না। তার দীর্ঘ কারাবাস, ব্যবসা হারানো এবং পরিবারের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস তুলে ধরে নেতাকর্মীরা বলছেন—এই আসনে তার অবদান ও ত্যাগের তুলনা নেই। ফলে এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে এবং প্রার্থী পুনর্বিবেচনার দাবি আরও জোরালো করে তুলছে।

একইভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম-১২ আসনের মনোনয়ন। ৫ আগস্টের পর এস আলম গ্রুপের গাড়িকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বহিষ্কৃত নেতা এনামুল হককে তালিকায় রাখা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের বিস্ফোরণ দেখা যাচ্ছে। অনেকে বলছেন, বিএনপির দুঃসময়ের কর্মীদের বাদ দিয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিকে আনায় নেতাকর্মীরা হতাশ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুষ্টিয়া, সুনামগঞ্জ, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, ঝিনাইদহসহ বহু আসনে একই চিত্র। কেউ কেউ গোপনে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাংগঠনিক শাস্তির ভয়ে, আবার অনেকে সরাসরি জানাচ্ছেন যে পুনর্বিবেচনা না হলে তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে নামবেন। নাটোর-১ আসনে এমন ঘোষণা আরও প্রকাশ্য। প্রয়াত বিএনপি নেতা ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুলকে মনোনয়ন দেওয়ার পর তার বড় ভাই ডা. ইয়াসির আরশাদ রাজনই মাঠে নেমে বোনের মনোনয়ন প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছেন। একই আসনে কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুর স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনাও জোরালো হয়ে উঠছে।

মাগুরা-২ আসনে গত ১৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিএনপির সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল ঘোষণা দিয়েছেন যে প্রার্থী পরিবর্তন না হলে তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করবেন। ফলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতি তৃণমূলের অস্বস্তি দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে।

অনেক আসনেই প্রার্থী ঘোষণা না করায় ক্ষোভ কম নয়। টাঙ্গাইল-৫, ঝিনাইদাহ-৪, লক্ষ্মীপুর-১, লক্ষ্মীপুর-৪ ও ঢাকা-১০সহ ৬৩ আসনে এখনো কোনো প্রার্থীর নাম প্রকাশ করেনি বিএনপি। এর ফলে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মনে করছেন তারা প্রচারে পিছিয়ে পড়ছেন, যখন প্রতিপক্ষরা যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। টাঙ্গাইলে স্থানীয় নেতারা অভিযোগ করছেন, জামায়াত অনেক আগেই তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করলেও বিএনপি এখনো অপেক্ষায় রাখায় প্রতিযোগিতায় তারা দুর্বল অবস্থানে পড়ছেন।

দলের একটি বড় অংশ মনে করছে, দীর্ঘদিন ধরে দলের প্রতি অনুগত, আন্দোলনের সময় কিংবা কঠিন সময়ে পাশে থাকা ত্যাগী নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। বরং অনেক স্থানে প্রভাবশালীদের চাপে বিতর্কিত বা দীর্ঘদিন রাজনীতির বাইরে থাকা নেতাদের নাম তালিকায় উঠে আসছে। এতে তৃণমূলের মননে প্রশ্ন বাড়ছে—দলের ভবিষ্যৎ কৌশল আসলে কোন দিকে যাচ্ছে?

তবে এসব সমালোচনার মাঝেও আশার আলো দেখছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তাদের বক্তব্য, ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু দল ভাঙবে না। আলোচনা, মতবিনিময়, এবং যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে বিএনপি শেষ পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য ও ঐক্যপূর্ণ মনোনয়ন তালিকা প্রকাশ করবে। ড. খন্দকার মোশারফের ভাষায়, অভিযোগ বা প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে, তবে শেষ পর্যন্ত যোগ্যদেরই প্রার্থী করা হবে এবং তৃণমূলের সব মতামত বিবেচনায় রাখা হবে।

নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু সরকারি প্রতিপক্ষ নয়, বরং নিজেদের ভেতরকার অসন্তোষও। প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকা যে দলের ভেতরে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন দেখার বিষয়—দল কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এই বিভক্ত মানসিকতা সামলে নির্বাচনের মাঠে ঐক্যবদ্ধভাবে নামতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত