শেখ পরিবারের বিদেশে নিরাপদ আয়েশে তৃণমূলে ক্ষোভ–হতাশা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬০ বার
শেখ পরিবারের বিদেশে নিরাপদ আয়েশে তৃণমূলে ক্ষোভ–হতাশা

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ ইতিহাসের কঠিনতম সংকটের মুখোমুখি। শীর্ষ নেতাদের একটি বড় অংশ এবং ক্ষমতাসীন পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করলেও দেশের ভেতরে তৃণমূল পর্যায়ের হাজারো নেতাকর্মী প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা, গ্রেপ্তার-আতঙ্ক ও জনরোষের মধ্যে সময় পার করছেন। বিদেশ থেকে পাঠানো নানা রাজনৈতিক নির্দেশনা ও কথিত আন্দোলনের ডাক মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে গিয়ে তারা আরো বেশি বিপর্যস্ত পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। সেই সঙ্গে বাড়ছে হতাশা ও ক্ষুব্ধতা।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে থাকা অসংখ্য আওয়ামী লীগ কর্মীর সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্য থেকে স্পষ্ট, দলটির নিচের সারির কর্মীরা মনে করছেন—বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে শীর্ষ নেতারা তাদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছেন; আর এই অযৌক্তিক নির্দেশে মাঠে নেমে তারা পদে পদে প্রতিরোধ, আক্রমণ ও আইনি চাপের মুখে পড়ছেন।

শেখ হাসিনাসহ পরিবারের সদস্যরা ভারতে, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে থাকলেও দেশের কর্মীদের এসব রাজপথের আহ্বান সফল হচ্ছে না। বরং প্রতিটি ব্যর্থ কর্মসূচির পর তাদের জীবনে নতুন করে বিপদ দেখা দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতৃত্বের এই দূরত্ব ও দায়িত্বহীনতার কারণে আওয়ামী লীগের সংগঠন কাঠামো তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্ষমতায় থাকা সাড়ে ১৫ বছরে শেখ পরিবার ও দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, লুটপাট ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দেশ-বিদেশে আলোচনা ছিল দীর্ঘদিন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিলে তার পরিবারের সদস্য ও প্রভাবশালী অনেক নেতা দ্রুত নিরাপদভাবে দেশত্যাগ করেন। পালানোর এই ধারায় মন্ত্রীর সন্তান থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতার কর্মচারী পর্যন্ত বিদেশে পাড়ি জমান বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। যারা যেতে পারেননি, তাদের অনেককে আটক হতে হয়েছে; কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন; কেউ বা রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে নীরব জীবন বেছে নিয়েছেন।

বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক বক্তৃতা, ভিডিও–বার্তা ও অনলাইনে আন্দোলনের ডাক দেশের কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। যারা মাঠে নামছেন, তাদের অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতার মুখোমুখি হচ্ছেন; কেউ শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষের ক্ষোভের। আবার অনেকেই আন্দোলনে অংশ নিলেও কোনো দৃশ্যমান রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারছেন না—ফলে মনোবল ভেঙে পড়ছে, বাড়ছে হতাশা।

গত আগস্টে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে অনলাইনে দেওয়া প্রথম বড় উসকানিতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে কয়েকজন কর্মী জনরোষের মুখে পড়েন। কেউ গণপিটুনির শিকার হন, কেউ আটক হন। একই পরিস্থিতি দেখা যায় ১০ ডিসেম্বরের কর্মসূচিতেও। তৃণমূলের কর্মীদের অভিযোগ, বিদেশে বসে দেওয়া এসব নির্দেশনার কারণে বাড়ছে রাষ্ট্রীয় নজরদারি, তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের মাত্রা। যারা দীর্ঘদিন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন পরিত্যক্ত, অসহায় ও অনিরাপদ বোধ করছেন।

শেখ হাসিনার লাইভ উপস্থিতির ঘোষণার পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে বুলডোজার দিয়ে ভাঙচুরের ঘটনায়ও দলের কর্মীরা দায় চাপান হাসিনার ওপর। তাদের মতে, ভুল সময় ভুল বার্তা দেওয়াতেই ঐতিহাসিক বাড়িটি বারবার ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এমন অভিযোগের পেছনে রয়েছেন তৃণমূল কর্মীরা, যারা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যেই পলাতক নেতাদের সমালোচনা করছেন।

হাসিনা ছাড়াও জাহাঙ্গীর কবির নানক, হাছান মাহমুদ, মাহবুব-উল আলম হানিফ, বাহাউদ্দিন নাছিম, শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও সজীব ওয়াজেদ জয় বিভিন্ন সময় অনলাইনে দেওয়া বক্তব্যে আন্দোলন উসকে দিয়েছেন বলে অভিযোগ তৃণমূলের। তাদের বক্তব্যে সাড়া দিতে গিয়ে ফরিদপুর অঞ্চলে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার চেষ্টার কথাও উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় সাধারণ কর্মীদের ওপর বাড়ছে সরকারি চাপ, বাড়ছে মামলা-হামলার ঝুঁকি।

রাজনীতিবিদ ও শিক্ষকরা মনে করেন, বিদেশে থাকা নেতৃত্ব মাঠের বাস্তবতা না বুঝেই দায়িত্বহীন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অনলাইনের উসকানিমূলক বার্তা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় তা বাস্তবায়নের সময় সংঘাত তৈরি হচ্ছে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক মনে করেন, বিদেশ থেকে দেওয়া নির্দেশনায় মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন, এতে তাদের মনোবল ভেঙে পড়ছে এবং নেতৃবৃন্দের প্রতি আস্থার সংকট বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, আওয়ামী লীগ এখন বিদেশে বসে বাংলাদেশবিরোধী আস্ফালন করছে, যা দেশের অভ্যন্তরে সহিংসতা উসকে দিতে পারে। তিনি মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্বাভাবিক জীবনযাপনকারীদের বিরুদ্ধে নয়, বরং নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেবে।

দলের ভেতরে এখন একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যাচ্ছে—বিদেশে বসে দেওয়া আন্দোলনের ডাক আর গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না। তৃণমূলের বহু নেতা প্রকাশ্যেই বলছেন, নিজেদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বিদেশ থেকে নির্দেশ দিয়ে তাদের ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে। যারা বিদেশে পালাতে পারেননি, তারা গ্রেপ্তার-ভয়, মামলা-মোকদ্দমা, জনরোষ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝখানে দিশেহারা। তাদের অভিযোগ, বিদেশে থাকা সুবিধাভোগীরা আন্দোলনের ফেনা তোলে, আর ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদেরকেই।

পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুল নেতৃত্ব, দায়িত্বহীন বার্তা এবং বাস্তবতা বিবেচনা না করেই আন্দোলনের ডাক দেওয়ার কারণে আওয়ামী লীগ এখন রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় অতীতের ভুলের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়ে রাজনৈতিক সংস্কারে মনোযোগী হলে দলটির গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা পুনরুদ্ধার হতে পারে—তৃণমূলেও এমন মতামত বাড়ছে। কিন্তু পলাতক নেতাদের তৎপরতা এবং বিদেশে বসে আন্দোলনের উসকানিতে সেই সম্ভাবনাও ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃণমূলের অনেকেই মনে করেন, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সুবিধার্থে আন্দোলনের নামে আর কেউ রাজপথে নামবেন না। বিদেশে বসে নির্দেশ দেওয়া গডফাদারদের প্রতিও তারা শেষ পর্যন্ত ‘না’ বলে দিয়েছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে ফেরাই এখন সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত