সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করেছে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৭০ বার
সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করেছে

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছে, যখন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করার ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছে। এই রায়ের মাধ্যমে দেশের সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এসেছে এবং এটি আগামী চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কার্যকর হবে। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ এবং অন্যান্য ছয়জন বিশিষ্ট বিচারপতির নেতৃত্বে এই রায় ঘোষণা করা হয় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে।

রায়ের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, জুবায়ের রহমান চৌধুরী, মো. রেজাউল হক, এস এম ইমদাদুল হক, এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং ফারাহ মাহবুব রয়েছেন। প্রধান বিচারপতি ও সাতজন বিচারপতির সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, যা দেশের সংবিধান ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়েছে, যদিও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারে অধীনে অনুষ্ঠিত হবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চতুর্দশ সংসদ নির্বাচনের পর কার্যকর হবে।

এই রায়ের আগে, গত ১১ নভেম্বর আপিল বিভাগের নির্বাচনী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের শুনানি শেষ হয়েছিল। শুনানি চলাকালীন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন দিক থেকে যুক্তি উপস্থাপন করেন। রিটের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া, বিএনপির পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ও ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহামদ শিশির মনির। এছাড়া ইন্টারভেনর হিসেবে শুনানি করেন ব্যারিস্টার এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিকী, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, অ্যাডভোকেট মহসীন রশিদ এবং ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক।

ইতিহাস অনুসারে, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয় ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। তবে এর বৈধতা নিয়ে প্রথম চ্যালেঞ্জ আসে ১৯৯৮ সালে, যখন অ্যাডভোকেট এম সলিম উল্লাহসহ তিনজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট করেন। ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট এই রিট খারিজ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করে। এরপর ২০০৫ সালে আপিল করা হয় এবং ২০১১ সালে আপিল বিভাগের সাতজন বিচারপতির সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করা হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপ ও পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে তোলপাড়ের পর ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস করা হয় সংশোধনী আইন, এবং ৩ জুলাই একই বছরের গেজেটে প্রকাশিত হয়। তবে সরকার পরিবর্তনের পর, ৫ আগস্ট ২০১১-এ এই রায়ের পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেন সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। এরপর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতে ইসলামের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারও রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনর্বহাল দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নতুন দিক নির্দেশ করবে। এই ব্যবস্থা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করতে পারে এবং ভোটের প্রকৃতিপ্রতিরোধের ক্ষেত্রে একটি নির্ভরযোগ্য ভূমিকা রাখে। দেশের রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।

সর্বোচ্চ আদালতের এই রায় শুধুমাত্র সংবিধানগত গুরুত্ব বহন করছে না, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এটি এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের মাধ্যমে আগামী নির্বাচনের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ গঠনের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রায়ের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণমূলক ধারা বজায় রাখার পথে সুপ্রিম কোর্ট একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে।

এর আগে নওগাঁর রানীনগরের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনও আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছিলেন। মোটমাট, এই রায়ে বহু বছরের রাজনৈতিক, সংবিধানগত ও আইনি লড়াই এক পর্যায়ে এসে ফলপ্রসূ হলো। এই রায়ের মাধ্যমে নির্বাচনী নিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও দেশের সংবিধান সম্মানিত হওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ সম্পন্ন হলো।

আপিল বিভাগের এই রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে। এটি প্রমাণ করে যে, দেশের সংবিধান ও বিচারব্যবস্থা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের ফলে, আগামী নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ ও ভোটের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হলো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত