প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র রূপ ধারণ করেছে। আসনের বিএনপি মনোনয়ন নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে দিন কয়েক আগে থেকেই। একদিকে তৃণমূলের অভিজ্ঞ নেতা ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি মীর শাহে আলম, অন্যদিকে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ মাহমুদুর রহমান মান্না। এই দুই প্রার্থীই নিজের রাজনৈতিক শক্তি ও জনপ্রিয়তা প্রমাণ করার জন্য ভোটের মাঠে সক্রিয়।
শিবগঞ্জে বিএনপির কর্মীরা এই মুহূর্তে নতুন ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যস্ত। দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ কে দেওয়া হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু দিন ধরে ছড়ানো গুজব অনুযায়ী, শাহে আলমকে তারেক রহমানের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে এই বিষয়টি স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এ ছাড়া খালেদা জিয়ার সাবেক অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার ও দলের ঘনিষ্ঠ নেতা ডা. ফিরোজ মাহমুদ ইকবালও মনোনয়নপ্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। এছাড়া সাবেক এমপি একেএম হাফিজুর রহমান এবং জেলা বিএনপির সহসভাপতি এমআর ইসলাম স্বাধীনকেও মনোনয়নপ্রার্থী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এই আসনের মনোনয়ন দিয়েছে অধ্যক্ষ মাওলানা শাহাদাতুজ্জামানকে, যিনি দীর্ঘদিন এই এলাকায় রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন।
শিবগঞ্জ আসন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়তাবাদী ধারায় প্রবাহিত। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা শাহাদাতুজ্জামান বিজয়ী হন। এরপর থেকে জামায়াতের রাজনৈতিক উপস্থিতি শক্তিশালী হয়। ১৯৯৬ সালে বিএনপির প্রার্থী হাফিজুর রহমান জয়ী হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আবারও রেজাউল বারী ডিনা বিজয়ী হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় আসনটি জাতীয় পার্টির হাতে চলে যায়। পরবর্তী দুটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টির শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ বিজয়ী হন।
গত ১২টি সংসদ নির্বাচনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিবগঞ্জে বিএনপি পাঁচবার, জাতীয় পার্টি তিনবার এবং আওয়ামী লীগ, জামায়াত, ফ্রিডম পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার করে জিতেছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, শিবগঞ্জে বিএনপির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দল অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও মনোনয়ন বিভাজনের কারণে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মাহমুদুর রহমান মান্না এলাকায় অনুপস্থিত থাকায় স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে তার সংযোগ সীমিত। তিনি এই আসন থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী হলেও দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যদি মীর শাহে আলমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, তবে জামায়াতের প্রার্থী শাহাদাতুজ্জামানের জন্য জয়ের সুযোগ অনেক কমে যাবে। মীর শাহে আলম উপজেলা থেকে ওয়ার্ড কমিটি গঠন করেছেন এবং তার তৃণমূল শক্তিশালী।
তবে মীর শাহে আলমকে নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। নির্বাচনী ইতিহাসে তিনি জীবনের প্রথম ইউনিয়ন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন নিয়মবহির্ভূতভাবে। পূর্ণ বয়স না হওয়া সত্ত্বেও প্রভাব খাটিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ঘটনায় আদালতে মামলা চলছিল। এই কারণে দলীয় হাইকমান্ডও মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় রয়েছে। দলের একাংশ মনে করে, মাহমুদুর রহমান মান্নাকে জোটের মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
মাওলানা শাহাদাতুজ্জামান মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ। ১৯৯১ সালে তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। আওয়ামী শাসনামলে এ অঞ্চলের জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হলেও স্থানীয় জনগণের মধ্যে তার প্রতি সহানুভূতি রয়েছে। প্রতিদিন হাটবাজার ও গ্রামে তিনি গণসংযোগ চালিয়ে ভোট চাচ্ছেন। তিনি বারবার ঘোষণা দেন, “ইনশাল্লাহ, আমার বিজয় সুনিশ্চিত। আমি এই অবহেলিত অঞ্চলকে নতুনভাবে সাজাতে চাই, বেকার ও শিক্ষিত যুবকদের নিয়ে কাজ করতে চাই এবং শিল্পাঞ্চল তৈরি করতে চাই।”
বিএনপির অন্য মনোনয়নপ্রার্থী এমআর ইসলাম স্বাধীন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। তরুণ ভোটারদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকায় তিনি এলাকায় জনপ্রিয়। তিনি বলেন, “আমি মানুষের চাহিদা বুঝে প্রার্থী হয়েছি। জনগণ পরিবর্তনের জন্য নতুন মুখ দেখতে চায়। সেই চাহিদা পূরণের লক্ষ্য নিয়েই ভোটের মাঠে নেমেছি।”
ডা. ফিরোজ মাহমুদ ইকবালও এলাকায় জনপ্রিয়। তিনি বলেন, “আমি গ্রামের মানুষ, সেখানকার মাটি আমাকে টানে। এখন যোগ্যতার মাপকাঠিতে দলই মূল্যায়ন করবে। দল যা সিদ্ধান্ত দেবে আমি তা মেনে নেব।” সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজুর রহমানও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। অভিজ্ঞ ও সিনিয়র রাজনীতিক হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে। তিনি বলেন, “আমি খালেদা জিয়ার পরীক্ষিত সৈনিক। অতীতের মতো এবারও মনোনয়ন চাইব এবং দলের জয় নিশ্চিত করতে মাঠে থাকব।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন বিএনপি শক্তিশালী থাকলেও এবার মনোনয়ন নিয়ে একাধিক নেতার লড়াই দলকে বিভক্ত করতে পারে। তৃণমূলের বিভাজন ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে। এতে জামায়াতের প্রার্থীও সুবিধা নিতে পারে। তবে শিবগঞ্জের ভোটাররা এবার বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা আশা করছেন।
মাওলানা শাহাদাতুজ্জামান এখনো তার ভোটব্যাংক ধরে রেখেছেন। জনসাধারণের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা এবং এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ তার প্রার্থীকে শক্তিশালী করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শিবগঞ্জে নির্বাচনের ফলাফল এই দুই দলের প্রার্থীর কার্যক্রম ও ভোটারদের আচরণের উপর নির্ভর করবে। বিশেষ করে বিএনপির মনোনয়ন প্রক্রিয়া কীভাবে শেষ হয় এবং দলের একতা বজায় থাকে, তা ভোটের ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
শেষপর্যন্ত বলা যায়, বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নির্বাচনী চিত্র এই মুহূর্তে জটিল। একদিকে অভ্যন্তরীণ মনোনয়ন দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোটের মাঠে উত্তেজনা আরও বেড়ে যাবে, এবং দলীয় সিদ্ধান্ত ভোটের সমীকরণে নির্ধারণমূলক প্রভাব রাখবে।