সাংবাদিকতায় ফোর্থ এস্টেট হওয়া মানে দায়িত্ব ও সাহস গড়ে তোলা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৩ বার
সাংবাদিকতায় ফোর্থ এস্টেট হওয়া মানে দায়িত্ব ও সাহস গড়ে তোলা

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে বৃহস্পতিবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের চার দশক পূর্তি উপলক্ষে সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত ‘জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশের গণমাধ্যম; স্বাধীনতা, নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে “ফোর্থ এস্টেট” বা চতুর্থ স্তম্ভের গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরেন ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, “মিডিয়া ইজ দ্য ফোর্থ এস্টেট—এই কথা বহুল প্রচারিত। কিন্তু সাংবাদিকতা ফোর্থ এস্টেট হতে হলে আপনাকে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে, যোগ্যতা অর্জন করতে হবে এবং সাহসী হতে হবে। দলের ভয় কিংবা কোনও রাজনৈতিক প্রভাব আপনাকে প্রতিহত করতে পারবে না।”

মাহমুদুর রহমানের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, একজন সাংবাদিকের কাজ কেবল সংবাদ পরিবেশনেই সীমাবদ্ধ নয়। সাংবাদিককে হতে হবে সমাজের ন্যায়বিচারের রক্ষক, ক্ষমতাসীনদের প্রশ্নকর্তা এবং জনগণের কণ্ঠ। তিনি বলেন, “ফোর্থ এস্টেট হওয়া মানে দলের কাছে ঝুঁকে না থাকা। আপনাকে অবশ্যই স্বাধীনভাবে, বস্তুনিষ্ঠভাবে এবং নিরপেক্ষভাবে সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা দলীয় চাপ আপনাকে বিরত করতে পারবে না।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, জুলাই বিপ্লবের পর নতুন বাংলাদেশ গঠিত হয়েছে। “গত ১৫ বছর ধরে দেশকে একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমাদের উপনিবেশিক মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সাংবাদিকদের দায়িত্ব এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সংবাদে কোনো ধরনের পক্ষপাত থাকা উচিত নয় এবং ক্ষমতাসীনদের দায়িত্বপূর্ণভাবে প্রশ্ন করতে হবে।”

মাহমুদুর রহমান সাংবাদিকতার তিনটি মূল দায়িত্বও তুলে ধরেন। প্রথম, সংবাদ তৈরি করা। তিনি বলেন, “সত্য, বস্তুনিষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করা সাংবাদিকতার প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব। আমাদের সংবাদ প্রকাশ করার সময় দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে হবে। সংবাদই মূল এবং এটি জনগণের কাছে সত্য পৌঁছানোর মাধ্যম।”

দ্বিতীয় দায়িত্ব, প্রশ্ন করা। সাংবাদিকদের উচিত ক্ষমতাধারী ব্যক্তিদের প্রশ্ন করা, বিনয় এবং শালীনতার সঙ্গে। “সাহস এবং সম্মান নিয়ে প্রশ্ন করতে হবে। সরকার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব—যাঁরা ক্ষমতাসীন, তাঁদেরও প্রশ্ন করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব।” তিনি আরও বলেন, “প্রশ্ন করার সময় বিনয় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনয় এবং সাহস ছাড়া কোনো সাংবাদিক সত্যের অনুসন্ধান করতে পারে না।”

তৃতীয় দায়িত্ব হিসেবে মাহমুদুর রহমান উল্লেখ করেন, বয়ান বা আল্টারনেটিভ ন্যারেটিভ তৈরি করা। তিনি বলেন, “সাংবাদিকরা শুধুমাত্র সংবাদ পরিবেশন করবে না, বরং সমাজে প্রকৃত তথ্য এবং বৈপরীত্য ধারণার স্থান তৈরি করবে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের মিডিয়াতে কিছু একপক্ষের মনোভাব বা ন্যারেটিভ প্রাধান্য পেয়েছে। সাংবাদিকদের কাজ হলো সেই একপক্ষীয় বয়ান চ্যালেঞ্জ করা এবং জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া।”

তিনি আরও বলেন, দৈনিক ‘আমার দেশ’ এই দায়িত্বের উদাহরণ হিসেবে কাজ করেছে। সংবাদপত্রটি যে সকল গুরুত্বপূর্ণ ন্যারেটিভ তৈরি করেছে, তা শুধুমাত্র জনগণের জ্ঞানের সম্প্রসারণে নয়, বরং সমাজের ন্যায়বিচার ও সঠিক তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, “সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের স্বার্থের বাইরে গিয়ে জনগণের পক্ষে কাজ করা, জনগণের চেতনা জাগানো এবং সমাজের জন্য সত্য প্রকাশ করা।”

সভায় উপস্থিত অন্যান্য বিশিষ্ট সাংবাদিক ও শিক্ষকরা মাহমুদুর রহমানের বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেন। তাঁরা বলেন, বর্তমান বাংলাদেশের মিডিয়া পরিবেশে স্বাধীনতা ও নৈতিকতা রক্ষা করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, বিশেষত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায়। এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের নিজের যোগ্যতা, সাহস এবং নৈতিক দায়িত্বের ওপর ভরসা করে কাজ করা জরুরি।

মাহমুদুর রহমানের ভাষায়, সাংবাদিকদের দায়িত্ব শুধু তথ্য সরবরাহ করা নয়, বরং সমাজের নৈতিক মানদণ্ড রক্ষা করা, জনগণকে সচেতন করা এবং ক্ষমতাধারীদের কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, “সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সততা, স্বচ্ছতা এবং বস্তুনিষ্ঠতা হলো ফোর্থ এস্টেট হওয়ার প্রধান ভিত্তি। সাংবাদিকতার এই আদর্শকে রক্ষা করতে হলে আমাদের নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা এবং নৈতিকতার ওপর নির্ভর করতে হবে।”

সভায় অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, ফোর্থ এস্টেটের সত্যিকারের শক্তি অর্জন করতে হলে শুধু সাংবাদিকদের নয়, সমগ্র মিডিয়া প্রতিষ্ঠানকেও স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা এবং নৈতিকতার সঙ্গে পরিচালিত হতে হবে। শুধুমাত্র এইভাবে সাংবাদিকতা সমাজে প্রকৃত অর্থে পরিবর্তন ও প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।

পরিশেষে মাহমুদুর রহমান বলেন, “যদি একজন সাংবাদিক এই তিনটি দায়িত্ব পালন করতে পারে—সংবাদ তৈরি, প্রশ্ন করা এবং বয়ান তৈরি করা—তাহলেই তিনি সত্যিকারের ফোর্থ এস্টেট হিসেবে সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন। এটি শুধুমাত্র একটি পেশা নয়, এটি একটি দায়িত্ব, একটি প্রতিজ্ঞা, এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার পরিচয়।”

এই আলোচনা সভার বক্তব্য এবং তাতে উত্থাপিত ধারণাগুলো বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাংবাদিকদের নিজেকে গড়ে তোলা, দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে থাকা এবং সাহস ও নৈতিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করাই হবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্থায়ী উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত