প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে আবারও ইতিহাস রচনা করলেন জনতা দল (ইউনাইটেড) বা জেডিইউ-র শীর্ষ নেতা নীতীশ কুমার। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দৃঢ় নেতৃত্ব আর বারবার ক্ষমতায় ফেরার ক্ষমতা দিয়ে তিনি এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন, যেখানে খুব কম ভারতীয় রাজনীতিক পৌঁছাতে পেরেছেন। রেকর্ড গড়ে দশমবারের মতো বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে তিনি শুধু নিজের দল কিংবা জোটের শক্তিকেই সামনে আনলেন না, বরং জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
ঐতিহাসিক গান্ধী ময়দানে বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হয় শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান। দিনের শুরু থেকেই সেখানে ভিড় জমতে থাকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। শপথ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যেন উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছিল পুরো এলাকার চারপাশে। মঞ্চে ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, যিনি শপথের পরপরই নীতীশকে শুভেচ্ছা জানান। রাজনৈতিক সহযোদ্ধার প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ অভিনন্দনের হাত বাড়িয়ে মোদি এদিন জানিয়ে দেন, এনডিএ জোটের ভরসার জায়গায় এখনও নীতীশ কুমারই প্রথম সারির নাম।
শপথবাক্য পাঠ করান বিহারের রাজ্যপাল আরিফ মহম্মদ খান। মঞ্চে ছিল দেশের আরও বহু শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা ছাড়াও এনডিএর ক্ষমতাসীন রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীরা একে একে উপস্থিত হন অনুষ্ঠানে। ফলে শপথ গ্রহণের মঞ্চটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতার জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল না—এটি ছিল এনডিএর শক্তি, ঐক্য ও রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনেরও একটি বড় উপলক্ষ।
বাংলার বাইরে ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত মুখগুলোর মধ্যে অন্যতম নীতীশ কুমার। গত দুই দশকে তিনি বহুবার জোটবদলের মধ্য দিয়ে গেলেও নিজের জনপ্রিয়তা ও প্রশাসনিক দক্ষতার কারণে বারবারই মানুষের আস্থার কেন্দ্রে ফিরেছেন। কখনো আরজেডির সঙ্গে জোট, কখনো এনডিএর সঙ্গে—রাজনীতির কঠিন হিসেব-নিকেশে বহুবার পথ বদলালেও বিহারের রাজনীতিতে তার অবস্থান অটল থেকে গেছে। প্রথমবার সমতা পার্টির হয়ে মুখ্যমন্ত্রী হন তিনি, যদিও সেই মেয়াদ ছিল মাত্র সাত দিনের। কিন্তু সেই সীমিত সময়ের মধ্যেই তিনি পরিচিত হন দৃঢ় সিদ্ধান্তের রাজনীতিক হিসেবে, যা পরবর্তী সময়ে আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
এরপর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন বিহারের রাজনৈতিক বাস্তবতার অনিবার্য নাম। আইনশৃঙ্খলা, অবকাঠামো, শিক্ষা ও নারীনিরাপত্তা—বিহারের এসব খাতে পরিবর্তনের গল্পে নীতীশ কুমারের নাম উচ্চারিত হয় বারবার। নতুন প্রজন্মের ভোটার থেকে শুরু করে গ্রামীণ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত, বহু স্তরের মানুষের মনেই তার প্রতি রয়েছে আস্থার জায়গা। দশমবার শপথ নেওয়ার মাধ্যমে তিনি যেন সেই আস্থার প্রতিফলনই আবারও তুলে ধরলেন।
এবারের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ যে জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভেসে গেছে, তার প্রমাণ মিলে ফলাফলে। ২৪৩টি আসনের মধ্যে ২০২টিতেই জিতেছে জোটটি। বিজেপি একাই পেয়েছে ৮৯ আসন, আর নীতীশের জেডিইউ পেয়েছে ৮৫টি। লোক জনশক্তি পার্টি (রাম বিলাস) ২৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতেছে ১৯টিতে। এছাড়া হিন্দুস্তানি আওয়াম মোর্চা পেয়েছে পাঁচটি এবং রাষ্ট্রীয় লোক মোর্চা চারটি আসন। বিপরীতে লালুপ্রসাদ যাদবের আরজেডি পেয়েছে মাত্র ২৫টি আসন, আর কংগ্রেস জিতেছে মাত্র ছয়টিতে। এই ফল শুধু এনডিএর শক্তিই তুলে ধরেনি, বরং বিজেপি–জেডিইউ জোটের প্রতি সাধারণ মানুষের অটুট সমর্থনও স্পষ্ট করেছে।
নীতীশ কুমারের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা শুধুমাত্র ক্ষমতায় থাকার গল্প নয়—এটি বিহারের সমাজ, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক বাস্তবতার পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তার দশমবার ক্ষমতায় ফেরা শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং একটি বার্তা—বিহারের জনগণ স্থিতিশীলতা চায়, উন্নয়ন চায়, এবং পরীক্ষিত নেতৃত্বকেই ক্ষমতায় দেখতে আগ্রহী। শপথ মঞ্চে মোদির উপস্থিতি থেকে শুরু করে এনডিএর পুরো শীর্ষ নেতৃত্বের সমবেত হওয়া—সবকিছু মিলিয়ে এদিনের অনুষ্ঠানটি শুধু বিহারের রাজনীতিকেই নয়, বরং ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এখন সবার দৃষ্টি নীতীশ কুমারের নতুন মেয়াদের দিকে। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা—এসব ক্ষেত্রে বিহারের সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তার পূর্ববর্তী মেয়াদগুলোই বলে দেয়, চ্যালেঞ্জকে সুযোগে পরিণত করার রাজনৈতিক দক্ষতা তার রয়েছে। দশমবারের মতো দায়িত্ব নিয়ে তিনি কি নতুন কোনো রাজনৈতিক নির্দেশনা দেবেন? বিহারের উন্নয়নের গতি কি আরও ত্বরান্বিত হবে? জাতি এখন তাকিয়ে আছে এই অভিজ্ঞ নেতার নতুন পথচলার দিকে।










