প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফেব্রুয়ারিতে হওয়ার জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকার মাত্র তিনটি আসনে বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ বিতরণের বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও জনসাধারণের মধ্যে যথেষ্ট প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২৭৪টি ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে খোঁজে দেখা গেছে, এই বরাদ্দের ২৭৩টি প্রতিষ্ঠানই কেন্দ্রীভূত রয়েছে ঢাকার মাত্র তিনটি আসনে—ঢাকা–৯, ঢাকা–১০ ও ঢাকা–১১। ঢাকার মোট ২০টি আসনের মধ্যে কেন শুধু এই তিন এলাকায় বরাদ্দ দেওয়া হলো, তা নিয়ে সমালোচনা ও সন্দেহের অবকাশ তৈরি হয়েছে।
বিবিসি বাংলা জানায়, বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকের বেশি, প্রায় ১৪৫টি প্রতিষ্ঠান, ঢাকার ঢাকা–১০ আসনের বিভিন্ন এলাকায়—ধানমন্ডি, কলাবাগান, হাজারীবাগ ও নিউমার্কেট—স্থিত। এই এলাকার মোট বরাদ্দ প্রায় ৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। উল্লেখযোগ্য হলো, সম্প্রতি স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ নিজের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করে এই আসনের ভোটার হয়েছেন এবং শিগগিরই এই আসন থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলমান।
এই প্রসঙ্গে তাকে প্রশ্ন করা হলে, বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে সুপারিশকারীদের সম্পর্কে তিনি জানান, “আমি জানি না কে বা কারা বিশেষ বরাদ্দের জন্য সুপারিশ করেছে। বরাদ্দের আবেদন বিভিন্নভাবে আসে। যারা আবেদন করেছে, তাদের প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “সারাদেশের অন্যান্য স্থানে বরাদ্দ হয়েছে। শুধু ঢাকার আসন নিয়ে রিপোর্ট কেন?”
ঢাকার ২৭৩টি বিশেষ বরাদ্দের মধ্যে বাকি ১২৮টি প্রকল্প ঢাকা–৯ ও ঢাকা–১১ আসনে বিতরণ করা হয়েছে। এই আসনগুলোতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা। বিশেষ বরাদ্দের এই কেন্দ্রায়ন নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন সমালোচনা তৈরি করেছে।
স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বরাদ্দ বিতরণের বিষয়টি ভোটের আগে বিতরণ হয়েছে কি না—এই প্রশ্নের জবাবে জানান, “বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার সময় শেষ হয়নি। সারাদেশে এই ধরনের বরাদ্দ চলছে।” তিনি আরও বলেন, যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো আবেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসেছে এবং বরাদ্দ শুধু আবেদন করা প্রতিষ্ঠানগুলোতেই দেওয়া হয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর আর এই ধরনের প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া যায় না। আগামী ডিসেম্বরের শুরুর দিকে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কথা রয়েছে। এই প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন, ‘‘নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে জেলা পরিষদে এডিপি হিসেবে বিশেষ কিছু আসনের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে তা নিঃসন্দেহে দৃষ্টিকটু এবং বিতর্কিত।’’
এর আগে, গত ৫ই অক্টোবর ঢাকার ১৪টি ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে ৪২ লাখ টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেসব বরাদ্দ ঢাকা শহরের অন্তত ১০টি আলাদা এলাকায় বিতরণ করা হয়েছিল, যার কারণে তাতে বিশেষ কোনো প্রশ্ন বা সমালোচনা তৈরি হয়নি। কিন্তু এবার তিন আসনে এতগুলো প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ কেন্দ্রীভূত হওয়ায় তা নির্বাচনী উদ্দেশ্য প্রভাবিত করার সম্ভাবনা নিয়ে জনমনে শঙ্কা তৈরি করেছে।
পলিটিকাল বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের ঢাকা–১০ আসনের ভোটার হওয়ার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এই আসনে প্রচুর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ বরাদ্দের এই কেন্দ্রায়ন নির্বাচনে সুবিধা দিতে পারে—যা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দিক থেকে প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বরাদ্দগুলো মূলত মসজিদ, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। তবে সময়ের সংযোগ ও উপদেষ্টার ভোটার এলাকা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এ বিতরণকে রাজনৈতিক প্রভাবের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিস্তারিত খোঁজে জানা গেছে, বরাদ্দের আবেদন প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে আবেদন জমা দেয়। এই প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বিতর্কের বিষয় হলো, কেন শুধুমাত্র তিনটি আসনকে বিশেষভাবে কেন্দ্র করে বরাদ্দ দেওয়া হলো, যেখানে অন্য এলাকায়ও বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রতিফলিত করছে কি না—এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেছেন, “যেকোনো বরাদ্দ বা প্রকল্পের ক্ষেত্রে আবেদন না করলে বরাদ্দ দেওয়া হয় না। এখানে যেখান থেকে আবেদন এসেছে, সেখানেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি নির্বাচন প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে নয়।” তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোটের আগ মুহূর্তে এই বরাদ্দ বিতরণ নির্বাচনকে প্রভাবিত করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
আগামী মাসের শুরুর দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় তিন আসনে এতগুলো বরাদ্দ বিতরণ ও নির্বাচনী সম্ভাব্য প্রার্থীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন ওঠেছে, তা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় উপদেষ্টা মাহমুদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এ ধরনের বরাদ্দ বিতরণ ও সময় সংযোগের কারণে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ বরাদ্দের প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা, বিতরণ নীতি এবং নির্বাচনী প্রভাব—এসব বিষয় এখন সরাসরি জনমনে ও মিডিয়াতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
উপসংহারে বলা যায়, নির্বাচনের আগে বিশেষ বরাদ্দের এই কেন্দ্রায়ন, ভোটার এলাকা পরিবর্তন এবং সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রার্থীর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। যদিও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বরাদ্দের আবেদন প্রক্রিয়াকেই বৈধতা হিসেবে উল্লেখ করছে, তবুও সময়ের সংযোগ ও বরাদ্দের কেন্দ্রায়ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলেছে। এই বিতর্ক আগামী নির্বাচনের আগে আরও আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।