প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন পে-স্কেল নিয়ে যে শোনা যাচ্ছে, তা একদিকে যেমন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, তেমনি বিভ্রান্তিও ছড়িয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ১৫ পৃষ্ঠার সুপারিশপত্রকে কেন্দ্র করে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেকে ধারণা করেছেন যে এটি কমিশনের অনুমোদিত নথি, তবে পে কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর।
নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের জন্য গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত সুপারিশ তৈরির প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতামত গ্রহণের কাজ আগামী সপ্তাহে শুরু হবে এবং তা শেষ হলে কমিশন তাদের রিপোর্ট চূড়ান্তকরণের দিকে এগোবে।
কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আলী খান গণমাধ্যমকে বলেন, “যে ১৫ পৃষ্ঠার সুপারিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি আমাদের তৈরি নয়। এমন কোনো নথি আমাদের কাছে নেই। এটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং বিভ্রান্তিকর। কমিশন দ্রুত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত রিপোর্ট তৈরির কাজ করছে। আমাদের এখনও গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিতে হবে। আগামী সোমবার সচিবদের সঙ্গে সভা রয়েছে, তারপরই চূড়ান্ত সুপারিশের ধারা নির্ধারিত হবে।”
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই নথিতে সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন গ্রেডের বেতন বৃদ্ধি, ইনক্রিমেন্ট কাঠামো এবং ভাতা সংশোধনের তথ্য দেয়া হয়েছে। এ তথ্যের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, গ্রেড ২০-এর চাকরিজীবীদের বেতন নতুন সুপারিশে কেমন হবে তা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কমিশন জানিয়েছে, এটি কোনো অনুমোদিত নথি নয় এবং তা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট ও মন্তব্যের মাধ্যমে নিজেদের ধারণা প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ আশা করছেন নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে, আবার কেউ কেউ সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, অনুমোদন ছাড়াই প্রচারিত নথিতে বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকার কারণে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে।
কমিশন আরও জানিয়েছে, এখনও কোথাও কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। নথি প্রকাশ বা ফাঁসও করা হয়নি। তবে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি কমিশনের নাম ও লোগো ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছেন। এই ধরনের মিথ্যা তথ্য সাধারণ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিভ্রান্তিকর এবং উদ্বেগজনক।
অর্থনীতিবিদ এবং বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি বেতন কাঠামোর চূড়ান্তকরণ ও প্রণয়নের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও যথাযথ হলে তা চাকরিজীবীদের মনোবল বাড়াবে। দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল বেতন কাঠামোর অভাব সরকারি কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে। নতুন কমিশনের মাধ্যমে এটি সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে, এবং কমিশন এই প্রক্রিয়ায় সতর্কতা অবলম্বন করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি বলেছেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার এ সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে। অর্থাৎ কমিশন এবং সরকার যথাযথভাবে কাজ শেষ করলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবিকভাবে কর্মীদের উপকারে আসবে। তবে সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ ইতিমধ্যে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নবম পে-স্কেল গেজেট প্রকাশ না হলে কঠোর কর্মসূচি শুরু করার কথা জানিয়েছে।
কমিশনটি গত জুলাইয়ে গঠিত হয়। সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানকে সভাপতি করে ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ গঠন করা হয়েছিল। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ ছিল, কমিশনের প্রথম সভার তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দিতে হবে। দীর্ঘ বিরতির পর সরকারি কর্মীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে সরকারি কর্মকর্তারা।
বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা এবং বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পে-স্কেল নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন মাত্রার উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এটি শুধুমাত্র সরকারি কর্মীদের মধ্যে নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, চূড়ান্ত সুপারিশ প্রকাশের পর অবশেষে বিষয়টি স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল হবে।
পে কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জনগণ ও সরকারি কর্মীরা যে কোনো অননুমোদিত নথি দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। অফিসিয়াল চ্যানেল এবং সরকারি ঘোষণার মাধ্যমেই নতুন পে-স্কেলের তথ্য প্রকাশিত হবে। কমিশন দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে, যাতে সরকারি কর্মীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য এবং বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো প্রণয়ন সম্ভব হয়।
এবারের প্রক্রিয়ায় শুধু বেতন বাড়ানো নয়, চাকরিজীবীদের ইনক্রিমেন্ট কাঠামো, ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধার সুষ্ঠু সমন্বয় করা হচ্ছে। এটি দেশের সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং কর্মীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এতটাই প্রবল যে, অননুমোদিত নথি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কমিশন জানিয়েছে, এই ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা প্রতিহত করা জরুরি। তাই তারা সচেতনভাবে কাজ করছে, যাতে সরকারি কর্মীরা বিভ্রান্ত না হন এবং নতুন পে-স্কেলের চূড়ান্ত তথ্য যথাসময়ে প্রকাশ করা সম্ভব হয়।
সবমিলিয়ে, নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের কাজ এখনো চলমান। কমিশন দ্রুত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট চূড়ান্ত করবে এবং সরকার ও সরকারি কর্মচারীরা চূড়ান্ত সুপারিশের জন্য প্রস্তুত হবেন। এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে শেষ হলে, এটি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচিত হবে।