প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভূমণ্ডলের নীরবতা ভেঙে রাতারাতি রাজধানী ঢাকা কেঁপে ওঠে শুক্রবার সকালে। সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে অনুভূত হয় ৫.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প। মাধবদীর নরসিংদী কেন্দ্রস্থল থেকে ঢাকার বিভিন্ন স্থান পর্যন্ত কম্পন ছড়িয়ে পড়ে, যা শহরবাসীকে মুহূর্তে আতঙ্কিত করে তোলে। রাজধানীর নাগরিকেরা হঠাৎ কেঁপে ওঠা ভবন, নড়বড়ে জানালা ও ঝাঁকানো বৈদ্যুতিক তার দেখে ভয় এবং আতঙ্কে ভুগতে শুরু করেন।
শহরের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা নিউমার্কেটে ভূমিকম্পের প্রভাবে ঘটে এক উদ্বেগজনক ঘটনা। স্থানীয়রা জানান, নিউমার্কেটে একটি বহুতল ভবন হেলে পড়েছে। সিলিং, দেয়াল এবং কাঠামোগত ফাটল দেখা দেয়, যা আশেপাশের দোকানদার ও ক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এই মুহূর্তে অনেক মানুষ নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ শুধু ভয়ে দাড়িয়ে থাকেন, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করেন।
ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তেই নেটিজেনরা বিভিন্ন ভবনের ফাটল ধরা এবং হেলে পড়া ছবি প্রকাশ করতে শুরু করেন। ছবিগুলোতে দেখা যায়, নিউমার্কেটের বহুতল ভবনটি ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক এবং উদ্বেগের ছবি স্পষ্ট। কেউ লিখেছেন, “মুহূর্তে শহর কেঁপে উঠলো। সবাই ভয়ে বাইরে ছুটছে।” শহরের সাধারণ মানুষ এবং দোকানদাররা একইসঙ্গে আতঙ্কিত ও অচেতনভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন নেসা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫.৭ এবং এর কেন্দ্রস্থল নরসিংদীর মাধবদী এলাকায়। তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পটি নরসিংদীর ঘোড়াশাল থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে উৎপন্ন হয়। ভূমিকম্পের কম্পন প্রায় ২০ সেকেন্ড স্থায়ী হয় এবং ঢাকার অনেক অংশে অনুভূত হয়।
নিউমার্কেট এলাকার ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা জানান, কম্পনের সময় তারা দোকান ও গুদাম বন্ধ করতে বাধ্য হন। কেউ কেউ জানিয়েছেন, “আমি দোকান থেকে বের হতে পারিনি, শুধু তাকিয়ে দেখছিলাম ভবন কেমন কেঁপে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল ভবনটি সবসময়ই ভেঙে পড়বে।” স্থানীয়দের আতঙ্ক স্পষ্ট। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই আশেপাশের উন্মুক্ত স্থানে নিরাপদে অবস্থান নেন।
এমন শক্তিশালী ভূমিকম্পের প্রভাবে রাজধানীর বিভিন্ন পুরনো ও নতুন ভবনে ফাটল দেখা দেয়। বিশেষ করে পুরনো ভবনগুলো ভূমিকম্পের সময় স্থায়িত্ব হারায়, যার ফলে মানুষের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। স্থানীয় প্রশাসন জানান, হেলে পড়া ভবনটি দ্রুত নিরাপদে খালি করা হয়েছে এবং আশেপাশের এলাকা রক্ষার্থে কাঁটা বেড়া দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের টিম কাজ করছে।
রাজধানীর সাধারণ মানুষ এবং পথচারীরা আতঙ্কিত হয়ে বাসা ও অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছেন। কেউ কেউ নিজের প্রিয়জনকে ফোন করে সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। স্কুল, অফিস এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো অল্প সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হয়। গাড়ি ও বাস চলাচলে বাধা তৈরি হয়, এবং মানুষের দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ফলে শহরের রাস্তাগুলো অস্থায়ীভাবে জমে যায়।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রাজধানী ঢাকার মতো দখলকৃত শহরগুলিতে ভূমিকম্পের এই ধরনের প্রভাব সাধারণত বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। পুরনো নির্মাণের ভবনগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তারা সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ভূমিকম্পের পর নাগরিকদের জন্য জরুরি সতর্কতা এবং নিরাপদ স্থানে অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ও নিউজ প্ল্যাটফর্মে মানুষ একে অপরকে সতর্ক করছে। কেউ লিখেছেন, “যদি ভূমিকম্প হয়, অবিলম্বে খোলা স্থানে চলে যেতে হবে।” অনেকে আতঙ্কিত হলেও সাহায্য ও সতর্কতার বার্তাও পাঠাচ্ছেন। এই মুহূর্তে সামাজিক সম্প্রীতি এবং একে অপরের প্রতি সহানুভূতি দৃশ্যমান।
নিউমার্কেটে হেলে পড়া ভবনটি শুধু স্থাপত্যগত সমস্যা নয়, বরং মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার প্রশ্নও তোলা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, দোকান-গুদাম ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসন এই ক্ষতি যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় প্রতিরোধে প্রশাসন ভবন পরিদর্শন ও স্থায়িত্ব পরীক্ষা আরও কঠোর করার পরিকল্পনা করছে।
শহরের নাগরিকদের মানসিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। এই ভূমিকম্প শহরের মানুষের মনে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে শিশুরা এবং বয়স্করা আতঙ্কিত। কেউ কেউ বলেন, “এমন সময় মনে হলো শহর পুরোপুরি কেঁপে যাচ্ছে। আমরা আতঙ্কিত হয়ে নিরাপদ স্থানে দৌড়াই।”
সবমিলিয়ে, শুক্রবারের এই ভূমিকম্প কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি শহরের মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার গুরুত্বকে আরও তীক্ষ্ণভাবে সামনে এনেছে। নিউমার্কেটে হেলে পড়া বহুতল ভবন, অন্যান্য স্থানে ফাটল ধরা ভবন এবং মানুষের আতঙ্কের প্রতিফলন তুলে ধরেছে যে, নগরায়ন ও নির্মাণের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। প্রশাসন, নাগরিক এবং ব্যবসায়ীরা মিলিতভাবে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় থেকে মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করা যায়।