প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র ভূমিকম্প অনুভূত হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫.৭। এর উৎপত্তিস্থল নির্ধারিত হয়েছে নরসিংদীর মাধবদীতে। দেশের সর্বশেষ ৩০ বছরের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবির জানান, “আজকের ভূমিকম্পে যে শক্তি রিলিজ হয়েছে তা নাকি হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে ফেলা পারমাণবিক বোমার সমান।” তিনি আরও বলেন, “দেশে এর আগে এই মাত্রার কম্পন দীর্ঘ সময় ধরে ঘটেনি। এটি একটি মারাত্মক সতর্কবার্তা।”
এখন পর্যন্ত জানা যায়, এই ভূমিকম্পে চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন ঢাকায় নিহত হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দেয়াল ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন, যদিও তাদের সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায়নি। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র তৎক্ষণাৎ জরুরি চিকিৎসা প্রদান করছে।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনের ফাটল ও দেয়াল ধসে পড়ার কারণে মানুষ আতঙ্কিত হয়েছে। অনেকেই উঁচু ভবন থেকে দ্রুত বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করেছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারীরা তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছেন।
শুক্রবার দুপুরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক বার্তায় জানান, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর অবিলম্বে মাঠে নেমে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করবে। প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, “জনগণের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।”
স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, ভূমিকম্পের সময় উঁচু ভবনগুলোতে বসবাসকারী মানুষ আতঙ্কে বাইরে বের হচ্ছিল। অনেক বাড়ির দেয়াল ফাটল ধরেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে বড় ধরনের ধ্বংস বা মৃত্যু ঘটতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থান এবং তিনটি প্লেটের সংযোগের কারণে দেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। ভূমিকম্প গবেষক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, “বাংলাদেশে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার শক্তিসম্পন্ন ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার মতো শক্তি জমা হয়েছে। যে কোনো সময় তা প্রকাশ পেতে পারে। প্রতিটি প্লেট বার্ষিক ভিত্তিতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরছে এবং সাবডাকশন জোনে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো সাবডাকশন জোনে ঘটেছে এবং এটি বড় ভূমিকম্পের প্রাক-সঙ্কেত। ফলে জনগণকে এখন থেকে প্রস্তুত থাকতে হবে। ভূমিকম্পের কারণে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ভবন নির্মাণে মানদণ্ড মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
শহর ও গ্রামাঞ্চলে মানুষের আতঙ্ক কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতাল প্রস্তুত রয়েছে যাতে আহতদের অবিলম্বে চিকিৎসা দেওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বড় ভূমিকম্প যে কোনো সময় ঘটতে পারে। তাই প্রতিটি পরিবার, স্কুল, অফিস এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে জরুরি পরিকল্পনা নিতে হবে। নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ ও জরুরি প্রস্তুতি নিশ্চিত করা সকলের জন্য অত্যাবশ্যক।
এদিকে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, রাস্তা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ তদারকি করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ মাঠে রয়েছে।
দেশবাসীকে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, সকল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে এবং জরুরি সেবা ও উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকবে।