রেকর্ড রেমিট্যান্সে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি: ১১ মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে ১১ বিলিয়ন ডলার

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৭ বার
রেকর্ড রেমিট্যান্সে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি: ১১ মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে ১১ বিলিয়ন ডলার

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের অর্থনীতি এক সময়ের গভীর মুদ্রা সংকট ও ডলারের রিজার্ভ ঘাটতির পর আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে পেয়েছে। আর এই পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে রেমিট্যান্স। দেশের ইতিহাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে এবার যে পরিমাণ বৃদ্ধি দেখা গেছে, তা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভই বাড়ায়নি, বরং সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিকে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জায়গায় নিয়ে এসেছে।

২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে রিজার্ভ যখন ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিচে নেমে এসেছিল, তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিল। ঠিক এমন সময়ে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে, রিজার্ভ বেড়ে ২০২৫ সালের জুনে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এ রিজার্ভের ভেতরে নিট রিজার্ভ—অর্থাৎ আইএমএফ-এর বিপিএম৬ মানদণ্ড অনুযায়ী হিসাব করা সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ অভূতপূর্ব বৃদ্ধির প্রধান কারণ হচ্ছে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রবাহ, যার পরিমাণ সদ্যসমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এটি দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে প্রাপ্ত সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এবং গত বছরের ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ২৬ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি।

এই পরিসংখ্যান পূর্ববর্তী রেকর্ড ২০২০-২১ অর্থবছরের ২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারকেও ছাপিয়ে গেছে, যখন কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের উপর কড়াকড়ি আরোপ এবং প্রণোদনা বন্ড চালুর মাধ্যমে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ানো হয়েছিল।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে একক মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ। পুরো অর্থবছরজুড়ে প্রতি মাসেই রেমিট্যান্স প্রবাহ ২ বিলিয়নের নিচে নামেনি—যা দীর্ঘ সময় ধরে দেশে দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, রেমিট্যান্সের পাশাপাশি মানি লন্ডারিং কমে যাওয়া, রপ্তানিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের নীতিগত সংস্কার এ রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তিনি জানান, “১২২ টাকার আশেপাশে ডলারের বিনিময় হার দীর্ঘদিন স্থিতিশীল রয়েছে, যা বাজারে আস্থা ফিরিয়েছে। আর ডলারের সরবরাহ এখন গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।”

তিনি আরও জানান, সরকারের নেওয়া সংস্কারমূলক পদক্ষেপ, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, পুঁজিবাজারে অনিয়ম ঠেকানো এবং প্রবাসীদের বৈধ উপায়ে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করাই এই অভূতপূর্ব রেমিট্যান্স প্রবাহের পেছনে মূল কারণ।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “ডলার সংকটের কারণে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, রেমিট্যান্স প্রবাহই তা ভেঙে দিয়েছে। এখন এলসি খোলায় আগের মতো জটিলতা নেই, এবং বাজারে তারল্য বেড়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “সরকার বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে নীতিগত উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোয় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। যদিও এখনই বলা যাবে না যে, সংকট একেবারেই কেটে গেছে, তবে অর্থনীতি যে আগের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীলতার পথে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।”

এদিকে প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি-এর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল কাইউম চৌধুরী মনে করেন, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স বেড়ে চলেছে। তিনি বলেন, “এই রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের স্বস্তি দিয়েছে, যা ডলার রিজার্ভের অতীত হ্রাসপ্রবণতা ঠেকাতে সাহায্য করেছে।”

তবে বিশেষজ্ঞরা এটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে প্রবাসী আয়ের পথ আরও সহজ করতে হবে, আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রণোদনা আরও বাড়াতে হবে এবং রপ্তানি বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি একসময় যে সংকটের মুখে পড়েছিল, সেই অবস্থায় এই রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ আশার আলো দেখাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই গতি ধরে রাখতে কতটা কৌশলীভাবে পরবর্তী নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এটিই হতে যাচ্ছে টিকে থাকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত