প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বলিউডের ইতিহাসে অনেক জুটি এসেছে, কিন্তু ধর্মেন্দ্র ও হেমা মালিনী জুটির প্রেম ও রসায়ন যেন বিশেষ এক আলাদা অধ্যায়। চলচ্চিত্র প্রেমীদের মনে আজও ‘শোলে’, ‘সীতা অউর গীতা’, ‘নসীব’ ও ‘আন্ধা কানুন’-এর মতো সিনেমা তাদের যুগল অভিনয়ের সৌন্দর্য্য ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু সিনেমার পর্দার আড়ালে তাদের সম্পর্কের গল্পও ছিল তেমনই আলোচিত এবং উত্তেজনাপূর্ণ। সম্প্রতি বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে যে, ধর্মেন্দ্র কিভাবে হেমা মালিনীর কাছাকাছি থাকার জন্য অভিনব চেষ্টা করেছিলেন।
এই গল্পের সূচনা ‘শোলে’ সিনেমার শুটিংয়ের সময়। সিনেমার একটি দৃশ্যে হেমা মালিনীকে রিভলবার দিয়ে গুলি করতে শেখানো হচ্ছিল। শুটিং চলাকালে ধর্মেন্দ্র নিজেই নিশ্চিত করতেন যে দৃশ্যটি একটিমাত্র টেকেও সঠিকভাবে ফিট হবে না। লাইটম্যানদের হাতে এমনভাবে কাজ করতেন, যাতে তারা বারবার ভুল করতে বাধ্য হন। তিনি প্রতিটি ভুলের বিনিময়ে লাইটম্যানদের ২০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতেন। এই অভিনব কৌশলের মূল কারণ ছিল স্পষ্ট—হেমা মালিনীর সঙ্গে নিজের শারীরিক ঘনিষ্ঠতা এবং কাছাকাছি থাকার সুযোগ। কয়েক দিন ধরে একের পর এক শুটিংয়ে লাইটম্যানদের মাধ্যমে এই ব্যাঘাত সৃষ্টি করায়, ধর্মেন্দ্র প্রায় ২ হাজার টাকার বেশি খরচ করেছিলেন।
হেমা মালিনীর সঙ্গে ধর্মেন্দ্রের সম্পর্ক শুধু শুটিংয়ের মজা নয়, বরং এটি ছিল গভীর ভালোবাসার শুরুর ইঙ্গিত। সিনেমার আলোচ্য প্রেম কাহিনী বাস্তবেও তাদের জীবনে প্রতিফলিত হতে শুরু করে। তবে তাদের সম্পর্কের পথে বাধা ছিল পরিবার এবং সামাজিক বিধিনিষেধ। ধর্মেন্দ্র তখন বিবাহিত ছিলেন, এবং তার স্ত্রী প্রকাশ কৌর তাকে ডিভোর্স দিতে রাজি ছিলেন না। এই পরিস্থিতি দুজনকেই বিপুল মানসিক চাপে ফেলেছিল।
ধর্মেন্দ্র ও হেমা মালিনী শেষ পর্যন্ত একসাথে থাকার জন্য ধর্মান্তর গ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালে ধর্মেন্দ্র নতুন নাম গ্রহণ করেন ‘দিলওয়ার খান কেওয়াল কৃষ্ণ’, আর হেমা মালিনী হন ‘আয়েশা বি আর চক্রবর্তী’। তাদের গোপনভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয় ১৯৭৯ সালের ২১ আগস্ট, মোহরানা ধার্য হয় ১ লাখ ১১ হাজার রুপি। পরে ১৯৮০ সালের ২ মে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের ঘোষণা দেন। এই বিয়ে বলিউডের মধ্যেই নয়, পুরো ভারতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
ধর্মেন্দ্র-হেমা জুটির জীবন কেবল প্রেম নয়, বরং চলচ্চিত্রের প্রতিটি টেকেও তাদের রসায়ন, আন্তরিকতা এবং প্রফেশনাল মানের প্রতিফলন ঘটায়। তাদের দুই কন্যা এশা দেওল এবং আহানা জন্ম নেওয়ার পরেও তারা সিনেমায় একসাথে কাজ চালিয়ে যান। মোট ৪২টি ছবিতে তাদের জুটি দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। ‘শোলে’তে অদ্ভুত রোমাঞ্চ এবং ‘সীতা অউর গীতা’তে কমেডির কেমিস্ট্রি, ‘নসীব’ ও ‘আন্ধা কানুন’-এ নাটকীয়তা—সবকিছুতে তাদের পারফরম্যান্সই দর্শকপ্রিয়তার মূল চাবিকাঠি ছিল।
শুধু সিনেমার মধ্যে নয়, সিনেমার বাইরে ধর্মেন্দ্র ও হেমা মালিনীর জীবনও ছিল গণমাধ্যমে আলোচিত। ধর্মেন্দ্রের ব্যক্তিগত জীবন ও তার সাহসিকতা প্রায়শই সংবাদে উঠে এসেছে। হেমার পরিবার প্রথম থেকেই ধর্মেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ককে মান্যতা দেয়নি, কিন্তু দুজনের ভালোবাসা ও একে অপরের প্রতি বিশ্বাস তাদের সমস্ত বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে।
ধর্মেন্দ্রকে শুধু একজন অভিনেতা হিসেবে নয়, বরং সাহসী প্রেমিক হিসেবেও মনে রাখা হয়। লাইটম্যানদের ‘ঘুষ’ দিয়ে হেমার কাছাকাছি থাকার কৌশল কেবল বিনোদনমূলক ঘটনা নয়, এটি তার ব্যক্তিত্বের এক দিককে ফুটিয়ে তোলে। এটি দেখায় যে তিনি শুধু চলচ্চিত্র নয়, বাস্তব জীবনেরও নাটকীয়তাকে পরিচালনার সক্ষমতা রাখতেন।
হেমা মালিনীর সঙ্গে ধর্মেন্দ্রের সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং চলচ্চিত্র জগতে রূপকথার মতো গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যুগলের প্রেম ও কাজের মিশ্রণ দর্শক এবং চলচ্চিত্র প্রেমীদের মনে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। তারা প্রমাণ করেছেন যে সিনেমার পর্দার রসায়ন বাস্তব জীবনের অনুভূতির সঙ্গে মিশে গেলে তা আরও শক্তিশালী হয়।
গত ২৪ নভেম্বর, ধর্মেন্দ্র ৮৯ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার চলে যাওয়া শুধু বলিউড নয়, সমগ্র ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্য এক বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। কিংবদন্তি এই অভিনেতার জীবন এবং কাজ প্রজন্ম পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলবে। ধর্মেন্দ্রের সঙ্গে হেমা মালিনীর প্রেম, তাদের অভিনয় ও চলচ্চিত্রে অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
চলচ্চিত্রজগতে ধর্মেন্দ্রের অবদানকে কখনো ভুলা যাবে না। তিনি শুধু দর্শকপ্রিয় নয়, বরং প্রেম, সাহস এবং চলচ্চিত্রের প্রতি নিষ্ঠার প্রতীক হিসেবেও মনে রাখবেন। হেমা মালিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রমাণ করে যে ভালোবাসা এবং প্রফেশনালিজম একসাথে জীবন ও শিল্পকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে। তার চলে যাওয়া হলেও তার কীর্তি, প্রেমকাহিনী এবং চলচ্চিত্রে অবদান চিরকাল বেঁচে থাকবে, যা নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস।