প্রকাশ: ৯ জুন’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে কেন্দ্র করে অর্থপাচারের এক জটিল ছক উদ্ঘাটন করেছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান এ খাতের আড়ালে বিভিন্ন রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে গোপনে অর্থপাচার এবং হুন্ডি বাণিজ্যের প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি শেষ হওয়া এক উচ্চপর্যায়ের আর্থিক পরিদর্শনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ব্যাংকার্স সভায় উপস্থাপিত এই গোপন প্রতিবেদনের মূল বিষয়বস্তু ঘিরে ব্যাংক খাত ও ব্যবসায়ী মহলে নতুন করে আলোড়ন শুরু হয়েছে।
সভায় উপস্থিত ব্যাংক প্রধানদের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পোশাক রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচারের মতো অপকর্ম কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে বিশেষত সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বাজারে পণ্য রপ্তানির সময় প্রকৃত দামের তুলনায় অনেক কম মূল্য ঘোষণা এবং ওজনের অস্বাভাবিক হেরফেরের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কোথাও কোথাও এক পণ্যের জন্য একাধিক ইনভয়েস দেখিয়ে কাগজপত্রে মিলন ঘটিয়ে পাচারের পথ সুগম করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অভিযোগের তথ্যপ্রমাণ ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো বেসরকারি ব্যাংকের গ্রাহকের নামে ইস্যু করা প্রোফর্মা ইনভয়েস অন্য ব্যাংকের গ্রাহক ব্যবহার করেছেন সেলস কন্ট্র্যাক্ট হিসেবে। ফলে সহজেই রপ্তানি ও আমদানির পুরো প্রক্রিয়ায় লুকোচুরি থেকে যাচ্ছে প্রকৃত অর্থপ্রবাহ। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে যেখানে পোশাক রপ্তানি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও দামে, ঠিক একই পণ্য মধ্যপ্রাচ্যের গন্তব্যে কয়েকগুণ কম মূল্যে দেখানো হচ্ছে, যেন দেশে ফেরত আসা টাকার বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে গোপনে বহির্বিশ্বে পাচার করা যায়। আর এই ফাঁদে দেশের প্রবাসী আয়ের প্রণোদনাও হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাবের বদলে দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিই।
সভায় এই বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি গভর্নর ব্যাংকগুলোকে তাগিদ দিয়েছেন, যেন কোনো গ্রাহক বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে গিয়ে শুল্ক ফাঁকি না দিতে পারে। এ জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং অনলাইন মনিটরিং পদ্ধতিকে আরও শক্তিশালী করার নির্দেশনা এসেছে। একইসঙ্গে গ্রাহকরা যাতে শাখায় না গিয়েও প্রয়োজনীয় লেনদেন অনলাইনে করতে পারে, সে ব্যবস্থা জোরদার করতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আরেকটি বড় অসঙ্গতি হিসেবে উঠে এসেছে এলসি দায় পরিশোধের পর গ্রাহকের নামে তাৎক্ষণিক ফোর্স লোন না সৃষ্টি করার প্রবণতা। ব্যাংকগুলো অনেক সময় আমদানিকারকের দায় নিজস্ব তহবল থেকে পরিশোধ করে দিলেও নিয়ম অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে ঋণ হিসেবে হিসাব করছে না। এতে একক ঋণ সীমা অতিক্রমের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিষয়ে কড়া বার্তা দিয়ে বলেছে, এখন থেকে দায় পরিশোধের সঙ্গে সঙ্গেই ফোর্স লোন সৃষ্টি করতে হবে, নতুবা কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে দেশের ব্যাংক খাতে শীর্ষ খেলাপি ঋণের চিত্রও কম ভয়াবহ নয়। ১০০ কোটি টাকা ও তার বেশি অঙ্কের খেলাপি ঋণই এখন ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৫৭ শতাংশের বেশি, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ ফেরত আনতে আইনগত পদক্ষেপ আরও গতিশীল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোর গৃহীত কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি তদারকির কথাও বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সভা শেষে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও তাদের পরিবারকে সম্মান জানাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক মিলে ২৫ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা হচ্ছে, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৫ কোটি টাকা দেবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নিয়ে এই নতুন প্রেক্ষাপট দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই যদি নিয়ন্ত্রণ না আনা যায়, তবে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা যেমন নষ্ট হবে, তেমনি বৈধ রপ্তানি আয়ের স্থিতিশীল প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যাবে। দেশের অর্থনীতির প্রধান রপ্তানি খাতকে যে কোনো মূল্যে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাখতে ব্যাংক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বিকল্প নেই—এমনটিই মত অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের।