বরেণ্য গিটারিস্ট সেলিম হায়দারের শেষ নিঃশ্বাস

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৭৩ বার
বরেণ্য গিটারিস্ট সেলিম হায়দারের শেষ নিঃশ্বাস

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো, ফিডব্যাক ব্যান্ডের বরেণ্য গিটারিস্ট সেলিম হায়দার চিরবিদায় নিলেন। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) রাত ১০টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। গিটারিস্ট সেলিম হায়দারের মৃত্যুতে দেশের সংগীতপ্রেমী ও সহকর্মীরা শোকস্তব্ধ। এই দুঃসংবাদটি নিশ্চিত করেছেন খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদার। শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) বাদ জুমা রাজধানীর হাতিরপুল পুকুরপাড় জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে মরহুমের জানাজা নামাজ।

সেলিম হায়দারের প্রয়াণ সংবাদ শুধু একটি ব্যান্ডের জন্য নয়, পুরো দেশের সংগীত ভুবনের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে গিটার আর সুরের মাধ্যমে হাজার হাজার শ্রোতার হৃদয়ে অনন্য ছাপ রেখেছেন। শেষ কিছুদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেছেন। সূত্রের খবর, ক্যানসারের পাশাপাশি অন্যান্য শারীরিক জটিলতায় তিনি ভুগছিলেন। চিকিৎসা চলাকালীন অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে এবং রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সেলিম হায়দারের সংগীত জীবন শুরু হয় বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের ব্যান্ড সংস্কৃতির সঙ্গে। ফিডব্যাক ব্যান্ডের আগে তার প্রথম ব্যান্ড ছিল ‘সন্ন্যাসী’, যেখানে প্রখ্যাত গায়ক শেখ ইশতিয়াক ছিলেন ভোকাল। এরপর সেলিমের গিটার তাঁর সুরের ছোঁয়ায় নতুন মাত্রা পায়। ফিডব্যাক ব্যান্ডে তিনি লিড গিটারিস্ট হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন। ‘মাকসুদ ও ঢাকা’ ব্যান্ডেও তার উপস্থিতি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গিটার বাজানোর ক্ষেত্রে নতুন উদাহরণ স্থাপন করে। সবশেষে তিনি ‘উল্লাস’ এবং ‘সেলিম হায়দার ও ফ্রেন্ডস’ ব্যান্ডে কাজ করেন, যেখানে তিনি সংগীতের নানা দিককে সমৃদ্ধ করেছিলেন।

সেলিম হায়দার ছিলেন কেবল লিড গিটারিস্টই নয়; তিনি বেজ, রিদম ও কি-বোর্ডেও সমান পারদর্শী ছিলেন। তার অন্তর্মুখী স্বভাব এবং সঙ্গীতের প্রতি নিষ্ঠা তাকে সহকর্মী ও ছাত্রদের কাছে প্রিয় করে তুলেছিল। দেশের প্রখ্যাত শিল্পী রুনা লায়লার সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন, যেখানে তার গিটার সঙ্গীতের সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এছাড়া, অসংখ্য সিনেমার গানে তার গিটার ঝঙ্কার শ্রোতাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলেছে।

ফিডব্যাক ব্যান্ডের গানের মধ্যে ‘এইদিন চিরদিন রবে’ এবং ‘ঐ দূর থেকে দূরে’ গান দুটি সেলিম হায়দারের সুর ও গিটার পারফরম্যান্সের অসাধারণ উদাহরণ। এই দুটি গান আজও শ্রোতাদের মধ্যে সমান জনপ্রিয়তা বজায় রেখেছে। ফিডব্যাকের প্রতিটি সুরে সেলিমের দক্ষতার ছোঁয়া স্পষ্ট। তার সুর, তার টোন, এবং গিটারের মেলডি শ্রোতাদের মনকে ছুঁয়ে গেছে এক অমোঘ অনুভূতিতে।

সংগীত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেলিম হায়দারের স্টাইল এক বিশেষ ধরনের অন্তর্মুখী সৃজনশীলতার পরিচায়ক। তিনি কখনও নিজের সাফল্যকে সামনে তুলে ধরতেন না, বরং সবসময় ব্যান্ডের সাফল্যকে প্রাধান্য দিতেন। এই নীরব অঙ্গীকার ও নিষ্ঠার কারণে তার প্রতি সহকর্মী ও ছাত্ররা সবসময় সম্মান ও শ্রদ্ধাশীল ছিল।

ফিডব্যাক ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠার সময় থেকে সেলিম হায়দারের অবদান ছিল অপরিসীম। ব্যান্ডের সঙ্গীত প্রতিটি যুগে বাংলাদেশের গিটার প্রেমীদের কাছে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। তার লিড গিটার বাজানোর ধরন, সৃজনশীল টোন এবং ছন্দের নিখুঁত মিল এই ব্যান্ডকে দেশের সেরা ব্যান্ডের মধ্যে স্থাপন করেছে। পাশাপাশি, তিনি নতুন প্রজন্মের গিটারিস্টদের অনুপ্রাণিত করেছেন এবং বিভিন্ন গিটার ও মিউজিক ক্লিনিক ও কর্মশালায় অংশ নিয়ে তাদের দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করেছেন।

শুক্রবার জানাজা শেষে মরহুমের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। কুলিয়ারচর উপজেলার ভিটিগাঁও গ্রামের এই কৃতিসন্তান বাংলাদেশের সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল এক অম্লান স্মৃতি হয়ে থাকবেন। তার মৃত্যুতে ফিডব্যাক ব্যান্ড, সহকর্মী শিল্পী, ছাত্র-শিষ্য এবং সংগীতপ্রেমীরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

ফেসবুক, টুইটার ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিল্পী ও ভক্তরা শোকপ্রকাশ করেছেন। অনেকেই লিখেছেন, “সেলিম হায়দারের সুর আমাদের জীবনের অংশ। তার অনন্য গিটার বাজানোর ছোঁয়া আমাদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।” অন্যরা জানিয়েছেন, “ফিডব্যাকের গানে তার অবদান অমর। তার চলে যাওয়া শূন্যতার অনুভূতি নিয়ে আসছে।”

বাংলাদেশের আধুনিক ব্যান্ড মিউজিকের ইতিহাসে সেলিম হায়দারের নাম এক স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে। শুধু সুর ও গিটার নয়, তার নিষ্ঠা, আন্তরিকতা এবং সঙ্গীতপ্রেমের প্রতি ভালোবাসা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে থাকবে। সেলিম হায়দারের জীবনের সব অর্জনই বাংলাদেশের সংগীত জগতে এক অমর উপহার।

এই মুহূর্তে দেশের সংগীতপ্রেমী ও শিল্পীরা শোকের ছায়ায় মগ্ন। তার চলে যাওয়া শুধু একটি ব্যান্ডের নয়, পুরো দেশের সংগীতপ্রেমীদের জন্য এক গভীর ক্ষতি। তবে তার সুর, তার সৃষ্টিশীলতা এবং গিটার বাজানোর ধারা চিরকাল জীবন্ত থাকবে। দেশের প্রতিটি মিউজিকপ্রেমী ও শিল্পী এই ক্ষতি অনুভব করছেন এবং তার অবদানকে স্মরণ করছেন।

সেলিম হায়দারের জীবন ও সংগীতকর্ম প্রমাণ করে, একজন শিল্পীর সত্যিকারের মূল্য তার সৃষ্টিতে এবং মানুষকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতায় নিহিত। তিনি গিটার, সুর এবং ব্যান্ড সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রতিটি শ্রোতার হৃদয়ে এক অনন্য ছাপ রেখেছেন। তার অনুপস্থিতি আমাদের দুঃখে আবৃত করেছে, কিন্তু তার সঙ্গীত চিরকাল বেঁচে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত