প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
‘হাওয়া’ দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও নাজিফা তুষির আলোচনায় আসাটা ছিল ধীর, কিন্তু স্থায়ী। সেই সিনেমার পর তিনি যেন এক অন্যরকম পরিচয়ে আবিষ্কৃত হন—নির্ভার অভিনয়, স্বাভাবিক প্রকাশভঙ্গি এবং নতুন মুখ হিসেবেও পর্দায় তাঁর অদৃশ্য অথচ গভীর উপস্থিতি দর্শকদের মন কাড়ে। সেই তুষিকেই আবার নতুন করে বড় পর্দায় দেখতে চলেছেন দর্শক। তাঁর অভিনীত নতুন সিনেমা ‘রইদ’, যা পরিচালনা করেছেন ‘হাওয়া’রই নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন। এই পুনর্মিলনকে ঘিরে দর্শকদের প্রত্যাশা ইতিমধ্যেই তুঙ্গে।
পরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘রইদ’-এর দৃশ্যধারণ শেষ হয়েছে গত বছরেই। এখন চলছে সিনেমার সম্পাদনার কাজ, যেখানে প্রতিটি দৃশ্য, শব্দ, পরিবেশ—সবকিছুকেই অত্যন্ত যত্নে সাজিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য, ‘হাওয়া’র মতোই বাস্তবতা ও অনুভূতির সংমিশ্রণে দর্শকের মনে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে যাওয়া। নাজিফা তুষির বিপরীতে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজ নূর ইমরান, যিনি নাটক ও চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান ক্রমেই দৃঢ় করছেন। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে আছেন গাজী রাকায়াত, দেশের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা।
সিনেমার গল্প নিয়ে খুব বেশি তথ্য দেননি নির্মাতা। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন এটি মূলত একটি প্রেমের গল্প। কিন্তু প্রেমই একমাত্র উপাদান নয়; সমসাময়িক সমাজ, সংস্কৃতি, মানুষের আশা–নিরাশা, পারিপার্শ্বিক বৈচিত্র্য এবং জীবনবোধ মিলিয়ে সিনেমাটি দাঁড়াবে এক ভিন্ন বয়ানের ওপর। তাঁর কথায়, ‘রইদ আঞ্চলিক নয়, বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবে। এর চরিত্রগুলো দেশের যেকোনো অঞ্চলের মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলে যাবে।’ সিনেমার বড় অংশের শুটিং হয়েছে সুনামগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলে। তবে লোকেশনকে কেন্দ্র করে কোনো আঞ্চলিক ভাষা বা সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। বরং লোকেশনের নৈসর্গিক সৌন্দর্য গল্পকে শুধু সমৃদ্ধ করেছে।
‘রইদ’-এ নতুন অভিনয়শিল্পীদের অংশগ্রহণও একটি বড় চমক। পরিচালক জানান, অনেকেই প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন। তাদেরকে যথাযথ প্রস্তুত করতে ছয় মাসব্যাপী গ্রুমিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এর সাথে যুক্ত ছিলেন খুলনা ও যশোরের অভিজ্ঞ থিয়েটার শিল্পীরাও, যাদের হাতে তৈরি হয়েছে নতুন প্রজন্মের এসব মুখ। মেজবাউর রহমান বিশ্বাস করেন, বাস্তববোধ ও অভিনয়ের গভীরতা চলচ্চিত্রে আনার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো থিয়েটার। আর সেই দর্শনই তাঁকে আবারও থিয়েটারভিত্তিক অভিনেতাদের প্রতি আশাবাদী করেছে।
সিনেমাটি নিয়ে দর্শকের মধ্যে বাড়তি কৌতূহলের কারণ হচ্ছে এর দীর্ঘ নির্মাণযাত্রা। চার বছর আগে ‘রইদ’-এর প্রথম ঘোষণা দিয়েছিলেন মেজবাউর রহমান। তখন সিনেমাটির প্রযোজক হিসেবে যুক্ত ছিলেন অভিনেত্রী জয়া আহসান। ২০২০–২১ অর্থবছরে সিনেমাটি সরকারি অনুদানও পেয়েছিল ৬০ লাখ টাকা। কিন্তু বিভিন্ন কারণে শুটিং শুরু হতে দেরি হওয়ায় জয়া আহসান সেই অনুদান সরকারকে ফেরত দেন। পরবর্তীতে প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হয় ‘বঙ্গ’ এবং সহ–প্রযোজক হিসেবে আছে নির্মাতার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ফেসকার্ড প্রডাকশন। নির্মাতা জানান, প্রযোজকের পরিবর্তন ও প্রস্তুতিমূলক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ‘রইদ’-এর মূল স্বপ্ন ও গল্প অপরিবর্তিত রয়েছে।
পরিচালকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই মাসেই আসবে ‘রইদ’-এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এরপর প্রকাশ পাবে সিনেমার ট্রেলার। যদি সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোয়, তবে আগামী জুন–জুলাইয়ে বড় পর্দায় দেখা মিলবে সিনেমাটির। তবে তিনি এটিও জানিয়েছেন যে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি শেষমেশ মুক্তির সময়সূচিতে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ দর্শকদের জন্য উপযুক্ত সময় বেছে নেওয়া এখন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন গল্পের প্রবেশ, নতুন মুখের আত্মপ্রকাশ ও আধুনিক নির্মাণশৈলী—সব মিলিয়ে ‘রইদ’ ইতিমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নাজিফা তুষির ভক্তরা যেমন তাঁর অভিনয়ের জন্য অপেক্ষা করছেন, ঠিক তেমনই মেজবাউর রহমান সুমনের ভক্তরা অপেক্ষা করছেন নতুন কোনো ব্যতিক্রমী গল্প কি তিনি এবার নিয়ে আসেন। ‘হাওয়া’-এর সাফল্যের কারণে তাঁকে ঘিরে দর্শকের প্রত্যাশা অনেক বেশি। নির্মাতা নিজেও জানেন সেই প্রত্যাশার ভার, এবং সেই কারণেই তিনি ‘রইদ’-কে আরও নিখুঁত করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের বর্তমান সময়ে যখন নতুন গল্প, নতুন নির্মাণশৈলী ও তরুণ অভিনয়শিল্পীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তখন ‘রইদ’ সেই সম্ভাবনার আরেকটি জানালা খুলে দিতে পারে। সিনেমাটি যে শুধু এক জুটি বা একটি প্রেমের গল্প নয়—এটি মানুষের জীবন, স্বপ্ন, সংগ্রাম, মায়া–মমতা এবং বাস্তবতার রোদ–বৃষ্টি মিলিয়ে তৈরি একটি জীবন্ত রূপকথা হতে পারে—এমন প্রত্যাশা ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে। আর সেই রূপকথার কেন্দ্রে রয়েছেন নাজিফা তুষি, যিনি ‘হাওয়া’–এর পর আবারও বড় পর্দায় আলো ছড়াতে প্রস্তুত।