প্রকাশ : ১০ জুলাই | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক স্বার্থের অংশ হিসেবে ইসরাইলে এক বিশাল সামরিক অবকাঠামো নির্মাণে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করছে ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত তথ্য এবং সাম্প্রতিক গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ইসরাইলের বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি হচ্ছে নতুন বিমানঘাঁটি, হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গার, গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার এবং আধুনিক কমান্ড সেন্টার। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে চায় বাইডেন প্রশাসন।
প্রেস টিভির একটি বিশদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ইসরাইলের নৌবাহিনীর অভিজাত ইউনিট শায়েতেত ১৩-এর জন্য নতুন সদর দপ্তর নির্মাণ। পাশাপাশি বর্ধিত এয়ারফোর্সের জন্য হেভি-লিফ্ট সিএইচ-৫৩কে হেলিকপ্টার এবং কেসি-৪৬ পেগাসাস ট্যাংকার বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও অপারেশনাল সুবিধা বাড়াতে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের টেন্ডার দেওয়া হয়েছে, যাতে এই প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হয়।
বারাক ওবামার প্রশাসনের সময় ২০১৬ সালে গৃহীত ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক সামরিক সহায়তা চুক্তির আওতাতেই এই বিনিয়োগ কার্যকর হচ্ছে। ওয়াশিংটন স্পষ্ট করেছে, এই অর্থ ইসরাইলি সামরিক সক্ষমতা আরও সুদৃঢ় করতে এবং উভয় দেশের ‘পারস্পরিক নিরাপত্তা স্বার্থ’ রক্ষায় ব্যয় করা হবে।
তবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই বিনিয়োগ কেবল নিরাপত্তার অজুহাতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলার লক্ষ্যেই এর বিস্তৃত পরিকল্পনা। ইসরাইল সম্প্রতি যে ১২ দিনের সামরিক আগ্রাসন ইরানের বিভিন্ন স্বার্থের বিরুদ্ধে চালিয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটেই ওয়াশিংটনের এই বিনিয়োগকে অনেকে পূর্বপরিকল্পিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, নতুন স্থাপনাগুলোর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে বিমানঘাঁটির রানওয়ে সম্প্রসারণ, হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গার ও গোলাবারুদ ভাণ্ডারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঠিকাদারি সংস্থা ও ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী যৌথভাবে এর নির্মাণ কাজ তদারকি করছে। সমালোচকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এভাবে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি জোরদার করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ইসরাইলি প্রশাসন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের এই বিনিয়োগকে দেশটির প্রতিরক্ষা কাঠামোর জন্য ‘আশীর্বাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাঁদের মতে, ইরানের প্রভাব, সিরিয়াসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান কর্মকাণ্ডের মুখে এ ধরনের সহায়তা ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ওয়াশিংটন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, তাদের এই পদক্ষেপ কেবল ইসরাইলের জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রেরও নিরাপত্তা নীতির অংশ। এর ফলে মার্কিন অস্ত্রশিল্পও লাভবান হবে, কারণ বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ও রক্ষণাবেক্ষণ খাত থেকে দেশটি বিশাল রাজস্ব পাবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সামরিক বিনিয়োগের কৌশলিক তাৎপর্য মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে ইরানের অবস্থান, আরব জোটের প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনের পাল্টা পদক্ষেপের ওপর। তবে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো মধ্যপ্রাচ্যে তার ‘অদৃশ্য ছায়া’ আরও শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন