প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মহান বিজয় দিবস বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি দিন নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, ত্যাগ ও মানবিক সাহসের চিরন্তন স্মারক। প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর এলেই এই চেতনাকে নতুন করে স্মরণ করতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নানামুখী আয়োজন দেখা যায়। টেলিভিশন পর্দায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক, চলচ্চিত্র ও বিশেষ অনুষ্ঠান যেন বিজয়ের আনন্দকে আরও গভীর করে তোলে। এই ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে এবার বিজয় দিবসে প্রচারিত হতে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিশেষ নাটক ‘ডাক্তার বাড়ি’, যা দর্শকদের সামনে তুলে ধরবে যুদ্ধকালীন এক পরিবারের মানবিক লড়াই, ভয় ও সাহসের গল্প।
নাটকটি নির্মিত হয়েছে প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরের বহুল আলোচিত ‘বাড়ি’ সিরিজের গল্প অবলম্বনে। দীর্ঘ কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে এই সিরিজের নাটকগুলো নির্মিত হয়ে আসছে, যা বাংলা টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত। ‘বাড়ি’ সিরিজের প্রতিটি নাটকেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি নির্দিষ্ট বাড়ি কীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, সহায়তা কিংবা নৈতিক শক্তির উৎস হয়ে উঠেছিল, সেই গল্প মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়। ‘ডাক্তার বাড়ি’ এই ধারাবাহিকতার ২১তম নাটক হিসেবে যুক্ত হলো।
‘ডাক্তার বাড়ি’ নাটকের গল্পে উঠে এসেছে গ্রামীণ এক ডাক্তারের পরিবারকে ঘিরে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা। যুদ্ধকালীন সময়ে যখন রাজাকার ও হানাদার বাহিনীর ভয়ে মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত, তখনও কিছু সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এই নাটকে সেই সাহসী মানুষগুলোরই প্রতিচ্ছবি দেখা যাবে। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গ্রামের ডাক্তারের মেয়ে মল্লিকা। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন সাদিয়া ইসলাম মৌ, যিনি বরাবরের মতোই সংবেদনশীল চরিত্রে নিজেকে দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন।
নাটকের গল্প অনুযায়ী, মল্লিকা তার বাবার অজান্তে দুইজন মুক্তিযোদ্ধাকে আশ্রয় দেয়। যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন সাহসের, তেমনি অন্যদিকে পরিবারের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির। এক পর্যায়ে রাজাকাররা বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ডাক্তারকে হুমকি দেয়—বাড়িতে লুকিয়ে রাখা মুক্তিযোদ্ধাদের বের করে দিতে হবে। এই হুমকির মুখে ডাক্তার ভয় পেয়ে যান। একজন পিতা ও একজন সাধারণ মানুষের দ্বন্দ্ব, পরিবারকে বাঁচানোর তাগিদ এবং দেশপ্রেমের দায়—সবকিছু মিলিয়ে তার মানসিক টানাপোড়েন নাটকের অন্যতম শক্তিশালী দিক।
এই সংকটময় মুহূর্তে মল্লিকা তার বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। সে অনুরোধ করে অন্তত একটি দিন অপেক্ষা করার জন্য। এই একদিনের সময়ই হয়ে ওঠে নাটকের আবেগঘন কেন্দ্রবিন্দু। দর্শক দেখতে পাবেন, কীভাবে একটি তরুণী মেয়ের দৃঢ়তা, মানবিকতা ও দেশপ্রেম একজন ভীত পিতার মনোবলকে নাড়িয়ে দেয়। এই অংশে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সাধারণ মানুষের নীরব প্রতিরোধ ও সাহসী অবস্থান খুব সংবেদনশীলভাবে ফুটে উঠেছে।
নাটকে সাদিয়া ইসলাম মৌ-এর বিপরীতে অভিনয় করেছেন আহসান হাবিব নাসিম। এই জুটির অভিনয় নাটকটিকে আরও প্রাণবন্ত করেছে। পাশাপাশি নরেশ ভুঁইয়া, রিয়া মনি প্রমুখ অভিনেতারাও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। প্রত্যেকের অভিনয়েই যুদ্ধকালীন আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও মানবিক সম্পর্কের টান স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে পার্শ্বচরিত্রগুলোর উপস্থিতি গল্পকে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।
নাটকটির চিত্রনাট্য লিখেছেন রাজু আলীম এবং পরিচালনা করেছেন অরুণ চৌধুরী। পরিচালকের মুন্সিয়ানায় গল্পের গতি, আবহসংগীত ও ক্যামেরার ব্যবহার একত্রে নাটকটিকে একটি পরিপূর্ণ রূপ দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটকে অতিরঞ্জন নয়, বরং সংযত ও বাস্তব উপস্থাপনই যে দর্শকের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে, ‘ডাক্তার বাড়ি’ তারই একটি উদাহরণ। গ্রামীণ পরিবেশ, বাড়ির ভেতরের দৃশ্য, আতঙ্কের মুহূর্তগুলো—সবকিছুতেই রয়েছে পরিমিত ও যত্নশীল নির্মাণশৈলী।
ফরিদুর রেজা সাগরের লেখা ‘বাড়ি’ সিরিজ মূলত নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প সহজ ও মানবিক ভাষায় তুলে ধরার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রয়াস। যুদ্ধের বড় বড় কৌশল বা সামরিক অভিযান নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনের ভেতর দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে প্রবাহিত হয়েছিল, সেটিই এই সিরিজের মূল উপজীব্য। ‘ডাক্তার বাড়ি’ নাটকটিও সেই ধারাকে বজায় রেখেছে। এখানে মুক্তিযোদ্ধারা কেবল যোদ্ধা নন, তারা কারও সন্তান, কারও ভাই, কারও স্বপ্নের অংশ।
বিজয় দিবসে এই নাটকটির প্রচার বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ বিজয়ের আনন্দের পাশাপাশি এটি দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতা কতটা ত্যাগ ও সাহসের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল। নাটকটি দেখে দর্শক শুধু গল্প উপভোগ করবেন না, বরং নিজেদের ভেতরেও দেশপ্রেম ও মানবিকতার প্রশ্নগুলো নতুন করে অনুভব করবেন।
চ্যানেল আইয়ের নিয়মিত বিজয় দিবসের আয়োজনের অংশ হিসেবে মহান বিজয় দিবসের দিন রাত ৭টা ৫০ মিনিটে ‘ডাক্তার বাড়ি’ নাটকটি প্রচারিত হবে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটকপ্রেমী দর্শকদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বিশেষ উপহার। সব মিলিয়ে, ‘ডাক্তার বাড়ি’ শুধু একটি নাটক নয়, এটি বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধের মানবিক গল্পকে নতুন করে উপলব্ধি করার একটি সুযোগ, যা দর্শকের মনে দীর্ঘদিন ধরে রেশ রেখে যাবে।