একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা পাচ্ছেন স্বস্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৯ বার
একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা পাচ্ছেন স্বস্তি

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগের মধ্যে থাকা লাখো আমানতকারীর জন্য অবশেষে স্বস্তির বার্তা এলো। একীভূত প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা আগামী সোমবার থেকেই নির্ধারিত সীমার মধ্যে তাদের জমাকৃত অর্থ তুলতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এসব ব্যাংককে একীভূত করে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, যার নাম ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’। ইতোমধ্যে এই নতুন ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূলত দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের চাপ এবং ব্যবস্থাপনাগত সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসেবেই এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, একীভূত ব্যাংকের গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কিছু প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। তবে সেগুলো এখন অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা গেছে। ফলে আগামী সোমবার থেকেই সংশ্লিষ্ট পাঁচ ব্যাংকের শাখা থেকে আমানতকারীরা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারবেন। এই অর্থ দেওয়া হবে আমানত বীমা তহবিল থেকে, যাতে গ্রাহকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো একজন গ্রাহকের যদি একটি ব্যাংকে একাধিক হিসাব থাকে, তাহলে তিনি কেবল একটি হিসাব থেকেই অর্থ তুলতে পারবেন। তবে কারও যদি পাঁচটি ব্যাংকেই আলাদা আলাদা হিসাব থাকে, সেক্ষেত্রে তিনি প্রতিটি ব্যাংকের হিসাব থেকেই নির্ধারিত সীমার মধ্যে টাকা উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। এতে করে তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আমানতকারীরা দ্রুত উপকৃত হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, যেসব গ্রাহকের হিসাবে দুই লাখ টাকার বেশি অর্থ জমা রয়েছে, তাদের জন্যও ধাপে ধাপে উত্তোলনের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রথম ধাপে দুই লাখ টাকা তোলার পর তিন মাস পরপর এক লাখ টাকা করে উত্তোলন করা যাবে। এই প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত চলবে। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় ৬০ বছরের বেশি বয়সী আমানতকারী এবং ক্যানসারে আক্রান্ত গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এই বিধান শিথিল করা হয়েছে। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো পরিমাণ অর্থ তুলতে পারবেন। ব্যাংকিং খাতে এই সিদ্ধান্তকে মানবিক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’র প্রধান কার্যালয় রাজধানীর সেনা কল্যাণ ভবনে স্থাপন করা হয়েছে। নতুন ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার সরাসরি ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে এবং আমানত বীমা তহবিল থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ধরা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা ভবিষ্যতে ব্যাংকটির কার্যক্রম বিস্তারে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার শূন্য করার নির্দেশ দিয়েছে। ব্যাংকগুলোর প্রকৃত সম্পদের মূল্য ঋণাত্মক হওয়ায় ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের আওতায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে করে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ কার্যত মূল্যহীন হয়ে গেছে, যা নিয়ে ইতোমধ্যে নানা আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে এই পাঁচটি ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মোট জমা রয়েছে প্রায় এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার একটি বড় অংশই ইতোমধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এই বিশাল খেলাপি ঋণের চাপই মূলত ব্যাংকগুলোকে দুর্বল করে তুলেছিল এবং একীভূতকরণের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছিল।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতকারীর সংখ্যা ২২ লাখের বেশি। এসব হিসাবে জমা রয়েছে প্রায় দুই হাজার ৫০০ কোটির বেশি টাকা। একই ব্যাংকে এক লাখ এক টাকা থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র আমানতকারী রয়েছেন, যাদের সঞ্চয়ই এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা পাচ্ছে।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগ কেবল অর্থ ফেরতের বিষয় নয়, বরং দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠার একটি বড় পদক্ষেপ। অনেক আমানতকারী গত কয়েক বছর ধরে নিজেদের জমানো অর্থ নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন। কারও কারও জীবনের সঞ্চয় আটকে পড়েছিল এসব ব্যাংকে। ফলে টাকা তোলার সুযোগ পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তি ফিরে এসেছে গ্রাহকদের মধ্যে।

সব মিলিয়ে, একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ধাপে ধাপে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ, সরকারের সরাসরি মূলধন সহায়তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে নতুন ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় ইসলামী ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্ট মহল। এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং ভবিষ্যতে আমানতকারীদের আস্থা কতটা দৃঢ়ভাবে পুনর্গঠিত করা যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত