মালয়েশিয়ায় রুবিও-ওয়াং বৈঠকে আলোচনার ইতিবাচক ইঙ্গিত, শুল্ক বিরোধে উত্তপ্ত পটভূমি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৬ বার
মালয়েশিয়ায় রুবিও-ওয়াং বৈঠকে আলোচনার ইতিবাচক ইঙ্গিত, শুল্ক বিরোধে উত্তপ্ত পটভূমি

প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত এক কূটনৈতিক সফরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর মধ্যে প্রথম দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত নতুন শুল্ক নীতির কারণে বিশ্ব বাণিজ্যে উত্তেজনা বেড়ে গেছে এবং এশিয়ায় দুই শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, শুক্রবারের এই বৈঠকটিকে উভয় পক্ষ ‘গঠনমূলক’ ও ‘ইতিবাচক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। যদিও পটভূমিতে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শুল্ক নীতি, যার জেরে চীন ও তার এশীয় মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

রুবিও মালয়েশিয়ায় তার প্রথম এশিয়া সফরে অংশ নিচ্ছেন, যেখানে তিনি আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরাম ও পূর্ব এশিয়া সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। সফরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা, তবে সেই প্রচেষ্টা অনেকটাই ছায়াচ্ছন্ন হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের হঠাৎ ঘোষিত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তে।

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা শুল্ক ব্যবস্থাকে ‘দাদাগিরি’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং বলেন, এই ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্যের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।

তবে মার্কো রুবিও তার বক্তব্যে কিছুটা আশাবাদী সুরে বলেন, “আমরা ভিন্নমত পোষণ করলেও সহযোগিতার পথ খোলা আছে। বৈঠকটি ভবিষ্যতের জন্য একটি গঠনমূলক ভিত্তি তৈরি করেছে।” তিনি আরও জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীন সফরের আমন্ত্রণ পেয়েছেন এবং এই সফর যেন ফলপ্রসূ হয় তা নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষকে প্রস্তুতি নিতে হবে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, বৈঠকে দুই দেশ তাদের নেতাদের মধ্যে হওয়া সমঝোতাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে সম্মত হয়েছে। এই বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে, বৈঠকটি উত্তেজনা প্রশমনের একধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।

তবে সফরটির পরিপ্রেক্ষিত বেশ উত্তপ্ত। ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে ঘোষণা দিয়েছেন, চীনসহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর নতুন উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করা হবে। এর মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার ও লাওসের পণ্যের ওপর ২৫% থেকে ৪০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। চীনের ক্ষেত্রে এই হার ১০০% এর বেশি, যা আগস্টের মাঝামাঝি কার্যকর হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান রুবিওর সফরকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক মারে হিবার্ট বলেন, “রুবিও কৌশলগত অংশীদারিত্বের বার্তা নিয়ে এসেছেন, কিন্তু ট্রাম্পের শুল্ক নীতি এই বার্তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।”

কুয়ালালামপুরে একাধিক আঞ্চলিক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নিজের স্বার্থ রক্ষায় যথেষ্ট সক্ষম এবং বহুপাক্ষিক ন্যায়সংগত বাণিজ্য কাঠামোর বিকল্প হতে পারে না একতরফা শুল্কনীতি।

আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একটি যৌথ বিবৃতিতে বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, শুল্ক ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও বিভক্ত করে তোলা হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত সবার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

এদিকে সফরের অংশ হিসেবে রুবিও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। ইউক্রেন ইস্যুতে কিছু নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে বলে জানান তিনি। এছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-জাপান-কোরিয়ার ‘অপরিহার্য ত্রিপাক্ষিক অংশীদারিত্ব’ বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

তবে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার একটি মন্তব্য—যেখানে তিনি বলেছেন টোকিওকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে—বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নিয়ে এক ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।

রুবিও এই বক্তব্যকে নেতিবাচকভাবে দেখেননি বরং বলেন, “এটি স্বাভাবিক ও স্বাধীন কূটনীতির বহিঃপ্রকাশ। যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপান মিলে সামনের দিনে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।”

মোটের ওপর মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত এই রুবিও-ওয়াং বৈঠক দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার মধ্যে একটি গঠনমূলক বার্তা দিয়েছে ঠিকই, তবে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বাণিজ্য নীতির ছায়া এখনো পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতের কূটনৈতিক অগ্রগতির অনেক কিছুই এখন নির্ভর করছে এই শুল্ক নীতি থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা ও পারস্পরিক আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত