প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
তুরস্কের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে চলা রক্তাক্ত সংঘাত ও সশস্ত্র লড়াইয়ের এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ঘোষণা দিয়েছেন, “আজ শুরু হলো একটি নতুন দিন, একটি নতুন অধ্যায়।” কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)-র অস্ত্র সমর্পণকে তিনি তুরস্কের জন্য ‘ঐতিহাসিক মোড়’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এ সিদ্ধান্ত তুর্কি ইতিহাসে শান্তির এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন।
শনিবার রাজধানী আঙ্কারায় ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একেপি) পার্টির ৩২তম পরামর্শ ও মূল্যায়ন সভায় দেয়া বক্তব্যে এরদোয়ান বলেন, “আজ তুরস্কের শতাব্দীর সূচনা হচ্ছে। আজ আমরা অতীতের বিভাজন, বিভ্রান্তি আর সহিংসতাকে বিদায় জানিয়ে ঐক্য ও শক্তির এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি।”
তার এ বক্তব্য আসে একদিন পরই, যখন ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দি এলাকায় একটি প্রতীকী অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০–৩০ জন পিকেকে যোদ্ধা অস্ত্র জমা দেন এবং তা ধ্বংস করেন। যদিও সংখ্যাটি বড় নয়, তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি বহু বছরের সহিংসতার অবসানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ধাপ। এমন একটি সংগঠন, যারা ১৯৮০-এর দশক থেকে তুর্কি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে এসেছে, তাদের এমন পদক্ষেপকে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বলেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলা এই সংঘাতে অন্তত ৪০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। কুর্দি জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও অধিকারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন বিভিন্ন সময় ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে, যার ফলে তুরস্ক ও প্রতিবেশী অঞ্চলজুড়ে সন্ত্রাস, অস্থিরতা ও সামরিক হস্তক্ষেপের পরিসর তৈরি হয়েছিল।
এরদোয়ান স্পষ্ট করে বলেন, এই অস্ত্র সমর্পণ কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা, চুক্তি বা দর কষাকষির ফসল নয়। বরং এটি হলো তুর্কি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর ভিত্তি করে গঠিত একটি “অভিন্ন জাতীয় চেতনার” জয়। তিনি বলেন, “এই দেশ আমাদের সকলের, আমাদের ঘর। তুর্কি, কুর্দি, আরব— যে পরিচয়ই হোক না কেন, আমরা সবাই ৮৬ মিলিয়ন মানুষ— এক অভিন্ন পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ। একসাথে আমরা বিজয়ী।”
তিনি আরও বলেন, “আজকের এই মুহূর্ত মালাজগির্টের বিজয়, জেরুজালেম জোট, আর স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনার পুনর্জাগরণ। এটি শুধু এক সংঘাতের ইতি নয়, বরং আমাদের ইতিহাসের এক গৌরবময় পর্বে প্রবেশ।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এরদোয়ানের এই উদ্যোগ একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি কৌশলগত অগ্রগতি, অন্যদিকে আসন্ন নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুরস্কের অবস্থান শক্ত করার জন্যও একটি চতুর পদক্ষেপ। তবে অনেকেই বলছেন, এই অস্ত্র সমর্পণ প্রক্রিয়ার স্থায়িত্ব নির্ভর করবে কুর্দি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অধিকার, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর কীভাবে রাষ্ট্র সাড়া দেয়, তার ওপর।
উল্লেখ্য, তুর্কি কর্তৃপক্ষ এরইমধ্যে ‘সন্ত্রাসমুক্ত তুরস্ক’ শীর্ষক এক নতুন নিরাপত্তা ও পুনর্গঠন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর আওতায় কুর্দি অঞ্চলগুলোতে নতুন করে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, শিক্ষা ও সংস্কারমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, এই মুহূর্তে প্রয়োজন সর্বোচ্চ সহিষ্ণুতা, আন্তরিকতা এবং কুর্দি জনগণের প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষার দায়বদ্ধতা। কারণ দীর্ঘ সময়ের সংঘাতের পর তৈরি হওয়া আস্থার সেতু যেন পুনরায় ভেঙে না পড়ে।
বিশ্বজুড়ে তুর্কি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এ গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে চোখ রাখছে অনেকেই। কেউ এটিকে নতুন সম্ভাবনার সূচনা বলে দেখছেন, কেউবা আবার আরও সংলাপ ও স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। তবে নিঃসন্দেহে, পিকেকে-র অস্ত্র সমর্পণ এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এর স্বীকৃতি তুরস্কের সমকালীন ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ পালাবদল। আর এই ঘটনাকেই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান অভিহিত করেছেন— “মহান ও শক্তিশালী তুরস্কের যাত্রার একটি শুভ সূচনা” হিসেবে।