প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যকার কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেল, যখন কিউবার রাষ্ট্রপতি মিগুয়েল ডিয়াজ-ক্যানেলসহ দেশটির শীর্ষস্থানীয় দুই মন্ত্রী এবং একাধিক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার ওপর কঠোর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন প্রশাসন। এই সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটি কড়া বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নেওয়া সাম্প্রতিকতম পদক্ষেপগুলোর ধারাবাহিকতায়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ ঘোষণা দিয়ে জানান, নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর করা হয়েছে ‘৭০৩১(গ) ধারা’ অনুযায়ী, যা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত সরকারী বা রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা মন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন কিউবার বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনীর মন্ত্রী আলভারো লোপেজ মিয়েরা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাজারো আলবার্তো আলভারেজ কাসাস। মার্কিন সরকার তাদের বিরুদ্ধে ‘২০২১ সালের জুলাই মাসে বিক্ষোভকারীদের বেআইনিভাবে আটক, নির্যাতন ও নিপীড়নের’ অভিযোগ এনেছে।
এই নিষেধাজ্ঞাগুলো শুধু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা কর্মকর্তাদের জন্যই নয়, বরং প্রযোজ্য হবে তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, বিচার বিভাগের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং প্রজাতন্ত্রের শাস্তি ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ কয়েকজন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও। যদিও পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা ব্যক্তিবিশেষের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র একইসঙ্গে কিউবার অন্তত ১১টি সম্পত্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ওয়াশিংটন মনে করে, এই সম্পত্তিগুলো কিউবার সরকারি কাঠামো বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো হাভানার বিলাসবহুল ‘টোরে কে হোটেল’। তবে বাকিগুলোর নাম এখনো জানানো হয়নি।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসন স্পষ্টতই সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ের কঠোর কিউবা নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে। ৩০ জুন হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত একটি স্মারকলিপিতে জানানো হয়, কিউবায় পর্যটন ভ্রমণের ওপর মার্কিন নাগরিকদের নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে কিউবার সঙ্গে যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য চুক্তি কিংবা বিনিয়োগ বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
স্মারকলিপি অনুসারে, ট্রাম্পের আদেশ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও বাণিজ্য বিভাগকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পররাষ্ট্র দপ্তরকে বলা হয়েছে, তারা যেন এমন সকল কিউবান প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির তালিকা তৈরি করে, যারা ‘যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সহযোগিতা ব্যবস্থাকে একতরফাভাবে ব্যবহার করছে’ বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন প্রশাসন শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, বরং কিউবার প্রভাবশালী ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের সম্পাদক ও তাঁদের ডেপুটিদেরও নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত হিসেবে বিবেচনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটাবে না, বরং কিউবার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এক ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো কিউবায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিচারবহির্ভূত আটক ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার।
এই মুহূর্তে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি নতুন করে ঘুরে এসেছে হাভানার দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান শুধু ভবিষ্যতের কূটনৈতিক নীতিতে নয়, বরং সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকান অঞ্চলে মার্কিন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিকেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, কিউবা এই পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় কী রকম অবস্থান গ্রহণ করে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কোন পথে মোড় নেয়।