প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গত ৪৮ ঘণ্টায় গাজা উপত্যকায় অন্তত ২৫০ বার বোমা হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ)। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিজস্ব বিবৃতিতে জানানো হয়, অন্তত পাঁচটি ডিভিশনের সমন্বয়ে তারা গাজায় আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে, যেখানে স্থলপথের পদাতিক বাহিনীর সহায়তায় বিমান বাহিনী প্রতিনিয়ত হামলা চালাচ্ছে এবং ‘কয়েক ডজন’ মানুষকে হত্যা করেছে। তবে এই “মানুষ” কারা, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্টতা তারা দেয়নি।
আইডিএফ তাদের ভাষ্যে বলছে, এই হামলাগুলো মূলত ‘সন্ত্রাসী ঘাঁটি’ লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী ঘাঁটি’র বড় অংশই বসতবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল বা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হত—যেখানে নারী ও শিশুরা অবস্থান করছিল।
গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী ধারাবাহিক গণহত্যামূলক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দীর্ঘায়িত আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন অন্তত ৫৭ হাজার ৮০০ জন ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যে নারীদের অনুপাত প্রায় ৪০ শতাংশ এবং শিশুদের সংখ্যা অর্ধেকের কাছাকাছি বলে জানায় স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো।
এদিকে, সংঘাতের মাত্রা বাড়তে থাকায় গাজার মানবিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো। ইউনাইটেড ন্যাশন্স রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্কস এজেন্সি (UNRWA) এবং অন্যান্য মানবিক সংস্থার হিসেবে, গাজায় অন্তত ১৮ লাখ মানুষ এখন গৃহহীন, যাদের বেশিরভাগই ক্ষুধা ও তীব্র চিকিৎসা সংকটে ভুগছে।
ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, তারা হামাসের অবকাঠামো ধ্বংসের লক্ষ্যে এসব অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, যদি লক্ষ্য শুধু সন্ত্রাসীদের হয়, তবে কেন প্রতিদিন শত শত নিরীহ মানুষ, শিশুরা ও অসুস্থ বৃদ্ধরা রক্তাক্ত হচ্ছে? কেন ধ্বংস করা হচ্ছে স্কুল, হাসপাতাল, জেনারেটর ও পানির পাইপলাইন?
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি আর কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে একটি একতরফা হত্যাযজ্ঞ, যেখানে একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে দিনের পর দিন সাধারণ মানুষকে হত্যা করে চলেছে। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ও কার্যত নিষ্ক্রিয়তা এই সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করছে।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর একের পর এক আক্রমণের ফলে গাজা শহরজুড়ে বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপায়টুকুও ক্রমাগত বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন বিশ্বের অন্য অংশে উন্নয়নের গল্প লেখা হচ্ছে, তখন গাজার মানুষ টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে ধ্বংসস্তূপের নিচে—মৃত্যুর সীমানায় প্রতিদিন।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ইসরায়েলের এ ধরনের আগ্রাসনকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল বলে মন্তব্য করলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে গাজায় রক্তপাত, অনাহার, শোক এবং ধ্বংস অব্যাহত রয়েছে।
গাজার নির্যাতিত মানুষদের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন—এই নিষ্ঠুরতার শেষ কোথায়? বিশ্ব বিবেক কি কখনো জেগে উঠবে? নাকি আরেকটি প্রজন্ম ধ্বংসের মুখে নিঃশব্দে হারিয়ে যাবে?