নেতানিয়াহুকে এখনই বিদায় নিতে হবে: যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে সরব সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৬ বার
নেতানিয়াহুকে এখনই বিদায় নিতে হবে: যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে সরব সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গাজায় দীর্ঘায়িত যুদ্ধ, ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর অমানবিক দমন-পীড়ন এবং জিম্মি মুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনা ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এক গভীর রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে এখনই বিদায় নিতে হবে।” তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে যুদ্ধের অস্পষ্ট ভবিষ্যৎ, মানবিক বিপর্যয় এবং এক নতুন ইসরায়েলি চেতনার উন্মেষের ইঙ্গিত।

ওলমার্টের এই বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ইসরায়েল ও হামাস যুদ্ধবিরতি এবং জিম্মিদের মুক্তি নিয়ে একটি সম্ভাব্য চুক্তির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ আলোচনাকে ‘সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অবস্থান’ বলে উল্লেখ করেছেন, যদিও অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এ ধরনের আশাবাদের পর ব্যর্থতাও এসেছে।

বর্তমান আলোচনার কাঠামো অনুযায়ী, হামাস ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে ১০ জন জিম্মিকে মুক্তি দিতে সম্মত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে পারস্পরিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত সমঝোতার পথে এখনও রয়ে গেছে বিস্তর মতপার্থক্য। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলমার্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হামাস তাদের হাতে থাকা সব জিম্মি মুক্তি দেবে না, যতক্ষণ না যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান নিশ্চিত হয়।

ওলমার্ট বলেন, ইসরায়েলের অবস্থান স্পষ্ট— গাজায় হামাসের কর্তৃত্ব পুরোপুরি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন যে, যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে এর আর কোনো ‘সামরিক অর্থবহ লক্ষ্য’ অবশিষ্ট নেই। “হামাসের সামরিক ক্ষমতা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা আর বড় কোনো হুমকি নয়,” মন্তব্য করেন তিনি।

তবে এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। ওলমার্টের ভাষায়, “ইসরায়েলি জনগণের মধ্যে এখন যুদ্ধের বিরোধিতা ক্রমশ বেড়ে চলছে। তারা আজই শান্তি চায়, জিম্মিদের মুক্তি চায়। অথচ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সেই দাবি শুনছেন না, এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।”

তিনি আরো বলেন, “নেতানিয়াহু এখন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছেন বটে, কিন্তু ওই সংসদের সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন প্রায় তিন বছর আগে। এখনকার বাস্তবতা, মনোভঙ্গি, জনমত বা দেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সে পার্লামেন্ট আর প্রতিনিধিত্ব করে না।”

সাবেক প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “নির্ভরযোগ্য সব জনমত জরিপ বলছে, ৬০ শতাংশেরও বেশি ইসরায়েলি নেতানিয়াহুকে আর বিশ্বাস করে না। এই আস্থা ও সমর্থনের অভাবের প্রেক্ষাপটেই তাকে দায়িত্ব ছেড়ে যেতে হবে। তাকে সরিয়ে দেওয়ার এখনই সময়।”

আলোচনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়েও মন্তব্য করেন ওলমার্ট। তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে ট্রাম্পের বিশাল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব রয়েছে। যদি তিনি চান, নেতানিয়াহুকে জিম্মি মুক্তি ও যুদ্ধবিরতির মতো মানবিক দাবি মানতে বাধ্য করতে পারেন। প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প আদৌ সেটা করবেন কি না?”

তিনি বলেন, “আজ যদি ট্রাম্প এই যুদ্ধ থামাতে ভূমিকা নেন, তাহলে ইসরায়েলি জনগণ তার পক্ষে অবস্থান নেবে। কারণ তারা আজ শান্তি চায়। তারা চায়, এই অকারণ যুদ্ধ বন্ধ হোক, এবং নিজেদের সন্তানদের আর প্রাণ হারাতে না হোক।”

মানবিক বিপর্যয়ের দিকটি তুলে ধরে ওলমার্ট বলেন, “৬০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের বড় অংশই শিশু এবং নিরীহ নাগরিক। এই যুদ্ধ এখন আর কোনো সামরিক যুক্তি বা নিরাপত্তা বয়ে আনছে না। এটি বরং ইসরায়েলের নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।”

গাজাকে ঘিরে ট্রাম্পের ‘মধ্যপ্রাচ্যের ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা’ বানানোর পরিকল্পনার প্রতিও নিজের স্পষ্ট বিরোধিতা জানান তিনি। বলেন, “আমি গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নের ঘোর বিরোধী। গাজা হলো ফিলিস্তিনিদের ভূমি। সেখানেই তাদের থাকা উচিত। আমাদের দায়িত্ব হওয়া উচিত, যাতে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আর সেখানে কর্তৃত্ব কায়েম করতে না পারে। কিন্তু গাজাবাসীদের উচ্ছেদ নয়।”

এই সাক্ষাৎকারে ওলমার্ট যে বার্তাটি স্পষ্টভাবে দিয়েছেন, তা হলো— যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নয়, বরং রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে এগোনোই এখন সময়ের দাবি। আর সেই পথে নেতানিয়াহুর উপস্থিতি শুধু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

তাঁর মতে, “ইসরায়েল থেকে এখন এক নতুন কণ্ঠস্বর উঠে আসছে— সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল, সহনশীল এবং ঐতিহাসিক সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানে আগ্রহী। এই নতুন কণ্ঠস্বরই ভবিষ্যতের ইসরায়েলের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু নেতানিয়াহু তার সঙ্গে থাকতে পারবেন না। তাই তাকে অবশ্যই বিদায় নিতে হবে— এবং সেটা যত দ্রুত হয়, ততই মঙ্গল।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত