শুধু বিলিয়নিয়ার নন, সংগীত ইতিহাসে প্রভাবশালী নারী বিয়ন্সে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩ বার
শুধু বিলিয়নিয়ার নন, সংগীত ইতিহাসে প্রভাবশালী নারী বিয়ন্সে

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

একসময় যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন শহরের এক কিশোরী স্থানীয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গাইত। চোখে ছিল স্বপ্ন, কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস, কিন্তু ভবিষ্যৎ তখনো অনিশ্চিত। সেই কণ্ঠের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এমন এক সম্ভাবনা, যা একদিন বিশ্ব সংগীতের মানচিত্র বদলে দেবে। সময়ের পরিক্রমায় সেই কিশোরী বিয়ন্সে নোলস আজ শুধু বিশ্বখ্যাত পপ তারকা নন, তিনি সংগীত ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী নারী এবং আনুষ্ঠানিকভাবে একজন বিলিয়নিয়ার।

বিয়ন্সের এই অবস্থানে পৌঁছানো কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে পরিকল্পিত পরিশ্রম, সৃজনশীল ঝুঁকি এবং ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার ফল। সংগীতজগতে জনপ্রিয় শিল্পীর অভাব নেই, কিন্তু খুব কম শিল্পী আছেন, যারা নিজের পরিচয়কে ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে পেরেছেন। বিয়ন্সে সেই বিরল উদাহরণ।

ফোর্বসের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিয়ন্সের মোট সম্পদ এক বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। এই অর্জনের মাধ্যমে তিনি সংগীতশিল্পীদের অভিজাত ‘বিলিয়নিয়ার ক্লাব’-এ প্রবেশ করেছেন। এই তালিকায় তাঁর আগে জায়গা করে নিয়েছেন তাঁর স্বামী জে–জেড, টেইলর সুইফট, ব্রুস স্প্রিংস্টিন ও রিয়ানা। তবে বিয়ন্সের ক্ষেত্রে এই বিলিয়নিয়ার হওয়ার গল্পটি কেবল অর্থনৈতিক সাফল্যের নয়, বরং এটি শিল্পী হিসেবে নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার গল্প।

বিয়ন্সের ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্ত আসে ২০০৮ সালে। ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকা অবস্থাতেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজের বিনোদন প্রতিষ্ঠান ‘পার্কউড এন্টারটেইনমেন্ট’। সেই সময় অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এটি হয়তো একটি আনুষ্ঠানিক বা প্রতীকী উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবে পার্কউডই হয়ে ওঠে বিয়ন্সের ভবিষ্যৎ সাম্রাজ্যের ভিত্তি। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নিজের সংগীত, কনসার্ট, ভিজ্যুয়াল অ্যালবাম ও তথ্যচিত্রের মালিকানা নিজের হাতে তুলে নেন।

এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত ছিল বড় ঝুঁকি। কারণ নিজে প্রযোজনা করলে খরচও বহন করতে হয় নিজেকেই। কিন্তু বিয়ন্সে জানতেন, লাভের বড় অংশও তখন তাঁর হাতেই থাকবে। সময় প্রমাণ করেছে, এই হিসাব ভুল ছিল না। পার্কউডের মাধ্যমে বিয়ন্সে এমন এক মডেল দাঁড় করান, যেখানে শিল্পী নিজেই নিজের ব্র্যান্ডের পরিচালক ও কৌশলবিদ।

সাম্প্রতিক বছরগুলো বিয়ন্সের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে শক্তিশালী সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া ‘রেনেসাস ওয়ার্ল্ড ট্যুর’ বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার আয় করে। এটি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই নয়, বরং নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। এই ট্যুরে বিয়ন্সে প্রমাণ করেন, লাইভ পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে তিনি এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

এর পরের বছর ২০২৪ সালে মুক্তি পায় তাঁর আলোচিত অ্যালবাম ‘কাউবয় কার্টার’। এটি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের আরেকটি সাহসী পদক্ষেপ। পপ ও আরঅ্যান্ডবি ঘরানায় প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হিসেবে তিনি হঠাৎ করেই কান্ট্রি সংগীতে হাত দেন। অনেকেই বিষয়টিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিলেন। কিন্তু বিয়ন্সে আবারও দেখান, তিনি নিয়ম ভাঙতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এই অ্যালবাম শুধু সমালোচকদের প্রশংসাই পায়নি, বরং এটি বাণিজ্যিকভাবেও সফল হয়।

‘কাউবয় কার্টার’ অ্যালবামকে কেন্দ্র করে ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত ট্যুরটি হয়ে ওঠে বছরের সর্বোচ্চ আয়কারী কনসার্ট ট্যুরগুলোর একটি। মার্কিন ব্যবসাবিষয়ক প্রকাশনাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, শুধু টিকিট বিক্রি থেকেই এই ট্যুরে আয় হয় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। এর সঙ্গে কনসার্টে বিক্রি হওয়া পণ্যসামগ্রী থেকে যোগ হয় আরও প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার।

ফোর্বসের বিশ্লেষণে দেখা যায়, পার্কউড এন্টারটেইনমেন্ট অধিকাংশ প্রকল্পে প্রযোজনার বড় অংশের খরচ নিজেই বহন করে। এর ফলে লাভের বড় অংশ সরাসরি বিয়ন্সের হাতে আসে। যেখানে অনেক শিল্পী রেকর্ড লেবেল বা প্রোমোটারের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে বিয়ন্সে নিজের কাজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। এই কৌশলই তাঁকে অন্য অনেক তারকার তুলনায় এক ধাপ এগিয়ে রেখেছে।

সংগীতের বাইরেও বিয়ন্সের আয়ের উৎস বহুমুখী। ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া তথ্যচিত্র ‘হোমকামিং: অ্যা ফিল্ম বাই বিয়ন্সে’-এর জন্য নেটফ্লিক্স থেকে তিনি আনুমানিক ৬০ মিলিয়ন ডলার পারিশ্রমিক পান। সে সময় এটি স্ট্রিমিং ইতিহাসের অন্যতম বড় চুক্তি হিসেবে আলোচিত হয়। এরপর ২০২৪ সালে নেটফ্লিক্সের ‘ক্রিসমাস ডে এনএফএল’ ম্যাচের হাফটাইম শোতে পারফর্ম করে তিনি আরও প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার আয় করেন।

এর আগে ‘রেনেসাস ওয়ার্ল্ড ট্যুর’ নিয়ে নির্মিত কনসার্ট ফিল্ম সরাসরি এএমসি থিয়েটার চেইনের মাধ্যমে মুক্তি পায়। ছবিটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৪ মিলিয়ন ডলার আয় করে, যার প্রায় অর্ধেকই বিয়ন্সের ঝুলিতে যায়। ২০২৫ সালে কনসার্ট ট্যুর, সংগীত ক্যাটালগ ও ব্র্যান্ড চুক্তি মিলিয়ে বিয়ন্সের মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ১৪৮ মিলিয়ন ডলার। এর ফলে তিনি ওই বছরের বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া সংগীতশিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পান।

তবে বিয়ন্সেকে কেবল আয় বা সম্পদের অঙ্ক দিয়ে বিচার করা যায় না। তিনি একাধারে শিল্পী, প্রযোজক, উদ্যোক্তা এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতি ও সৃজনশীল স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান তাঁকে সমসাময়িক পপ সংস্কৃতির অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠে পরিণত করেছে। তাঁর প্রতিটি প্রকল্পে নিজের পরিচয়, ইতিহাস ও সামাজিক বার্তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরার চেষ্টা দেখা যায়।

বিয়ন্সের বিলিয়নিয়ার হওয়া মানে শুধু ব্যক্তিগত সম্পদের বৃদ্ধি নয়। এটি প্রমাণ করে, সৃজনশীলতা ও ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা একসঙ্গে চলতে পারে। একজন শিল্পী চাইলে নিজেই নিজের ব্র্যান্ডের পরিচালক, প্রযোজক ও কৌশলবিদ হতে পারেন। ফোর্বসের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সংগীত, কনসার্ট, স্ট্রিমিং, চলচ্চিত্র ও বিনিয়োগ—সব মিলিয়েই বিয়ন্সে পৌঁছে গেছেন বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে।

আজ বিয়ন্সে আর শুধু একজন পপ তারকা নন। তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন এবং আধুনিক বিনোদন শিল্পের এক শক্তিশালী অধ্যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত