প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কে–পপের বৈশ্বিক জোয়ারে ব্ল্যাকপিংক যে এক অনন্য নাম, তা নতুন করে প্রমাণ হলো জাপানের টোকিও ডোমে। ওয়ার্ল্ড ট্যুর ‘ডেডলাইন’ নিয়ে টানা তিন দিন টোকিও ডোমের মঞ্চ মাতিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় এই গার্ল গ্রুপ। ওয়াইজি এন্টারটেইনমেন্ট জানিয়েছে, ১৬ থেকে ১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত তিনটি শোতে মোট ১ লাখ ৬৫ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। বিশাল এই দর্শকসংখ্যা শুধু একটি কনসার্টের পরিসংখ্যান নয়, বরং ব্ল্যাকপিংকের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা ও প্রভাবের শক্ত প্রমাণ।
কনসার্ট শুরুর মুহূর্ত থেকেই দর্শকদের উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। আলো-আঁধারির নাটকীয় পরিবেশে মঞ্চে উঠে ‘কিল দিস লাভ’ দিয়ে শো শুরু করেন রোজে, জেনি, লিসা ও জিসু। প্রথম গানের তালে তালে দর্শকদের চিৎকার আর হাততালি যেন পুরো টোকিও ডোমকে কাঁপিয়ে তোলে। এরপর ‘পিংক ভেনম’-এর তীব্র বিটে দর্শকদের উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। চার শিল্পীর কণ্ঠের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকরাও গলা মিলিয়ে গাইতে থাকেন, তৈরি হয় এক অনন্য সমবেত অভিজ্ঞতা।
গান আর নাচের নিখুঁত সমন্বয়ে ব্ল্যাকপিংক বরাবরের মতোই মঞ্চে তুলে ধরেছে তাদের স্বাক্ষর পারফরম্যান্স। কোরিওগ্রাফির প্রতিটি ধাপ, আলোর ব্যবহার ও ব্যাকগ্রাউন্ড ভিজ্যুয়াল—সব মিলিয়ে কনসার্টটি ছিল এক পূর্ণাঙ্গ দৃশ্য-শ্রাব্য অভিজ্ঞতা। ‘হুইসেল’, ‘বুম্বায়া’, ‘জাম্প’সহ একের পর এক জনপ্রিয় গান পরিবেশন করেন তাঁরা। প্রতিটি গানের সঙ্গে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হয়ে ওঠে। টোকিও ডোম যেন রীতিমতো একটি বিশাল গানের উৎসবে পরিণত হয়।
বিশেষ করে ‘বুম্বায়া’ পরিবেশনের সময় দর্শকদের নাচ-গান আর উল্লাসে মঞ্চের সঙ্গে গ্যালারির সীমারেখা মুছে যায়। আর সাম্প্রতিক আলোচিত গান ‘জাম্প’ পরিবেশনের সময় পুরো ডোমজুড়ে মোবাইল ফোনের আলো আর দর্শকদের কণ্ঠে কণ্ঠে গাওয়া গান এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে। এই গানটি ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশের পর থেকেই শ্রোতাদের মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলেছিল এবং বিলবোর্ডের গ্লোবাল ২০০ তালিকার শীর্ষে উঠে আসে।
তিন দিনের কনসার্টের শেষভাগে আবেগ সামলাতে পারেননি ব্ল্যাকপিংকের সদস্যরা। দর্শকদের উদ্দেশে রোজে, জেনি, লিসা ও জিসু বলেন, সময় যে এত দ্রুত কেটে গেল, তা ভাবতেই তাঁদের খারাপ লাগছে। তাঁরা জানান, এই তিন দিনে দর্শকদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছেন, তা তাঁদের কাছে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাঁরা বলেন, ব্ল্যাকপিংকের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে ভক্তদের অবদান সবচেয়ে বড়।
জাপানে ব্ল্যাকপিংকের জনপ্রিয়তা নতুন কিছু নয়। আগেও দেশটিতে একাধিক সফল কনসার্ট করেছে গ্রুপটি। তবে এবারের ‘ডেডলাইন’ ট্যুরের টোকিও ডোম শোগুলোকে অনেকেই বিশেষভাবে দেখছেন। কারণ, দীর্ঘ সময় পর নতুন অ্যালবামের ঘোষণা আর ট্যুরের শেষ ধাপ—এই দুই বিষয় মিলিয়ে ভক্তদের উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। তিন দিনে ১ লাখ ৬৫ হাজার দর্শকের উপস্থিতি সেই উত্তেজনারই প্রতিফলন।
টোকিও ডোমের শো শেষ করেই ব্ল্যাকপিংক পাড়ি জমাবে হংকংয়ে। সেখানে কাই তাই স্পোর্টস পার্কে ২৪ থেকে ২৬ জানুয়ারি টানা তিনটি শো করবে গ্রুপটি। এই শোগুলোর মাধ্যমেই ওয়ার্ল্ড ট্যুর ‘ডেডলাইন’-এর পর্দা নামবে। হংকংয়ের শোগুলোর টিকিট নিয়েও ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানেও দর্শকসংখ্যা ও উন্মাদনা কম হবে না।
কনসার্টের পাশাপাশি ব্ল্যাকপিংক ভক্তদের জন্য আরেকটি বড় সুখবর হলো নতুন অ্যালবামের ঘোষণা। সাড়ে তিন বছর পর নতুন অ্যালবাম নিয়ে ফিরছে এই জনপ্রিয় কে–পপ গ্রুপ। আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হবে তাদের তৃতীয় ইপি ‘ডেডলাইন’। এই অ্যালবামে থাকবে ‘জাম্প’সহ একাধিক নতুন গান, যেগুলো নিয়ে ইতোমধ্যেই ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ব্ল্যাকপিংকের অ্যালবাম প্রকাশের ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, প্রতিটি কাজই তারা সময় নিয়ে, পরিকল্পিতভাবে প্রকাশ করে। ২০১৯ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত হয় তাদের ‘ইপি কিল দিস লাভ’, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে আসে দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যালবাম ‘বর্নপিংক’। সেই অ্যালবাম ব্ল্যাকপিংককে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেয় বিশ্বসংগীতের মূলধারায়। সাড়ে তিন বছর পর আসতে যাওয়া ‘ডেডলাইন’ ইপি নিয়েও তাই প্রত্যাশার পারদ চড়ছে দ্রুত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্ল্যাকপিংকের এই দীর্ঘ বিরতি আসলে তাদের সংগীতকে আরও পরিণত ও বৈচিত্র্যময় করেছে। একদিকে দলগত কাজ, অন্যদিকে সদস্যদের একক প্রকল্প—সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে চার শিল্পীর ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিকাশ ঘটেছে। নতুন অ্যালবামে তার প্রতিফলন থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
টোকিও ডোমের কনসার্টে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া দেখেই বোঝা যায়, ব্ল্যাকপিংকের প্রতি ভালোবাসা শুধু সংগীতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়, একটি আবেগের নাম। কে–পপকে যে বৈশ্বিক মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্ল্যাকপিংক বড় ভূমিকা রেখেছে, টোকিওর এই তিন দিনের কনসার্ট সেটিই আবারও মনে করিয়ে দিল।
সব মিলিয়ে, ১ লাখ ৬৫ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে টোকিও ডোমে ব্ল্যাকপিংকের কনসার্ট ছিল সংগীত, আবেগ ও তারকাখ্যাতির এক অনন্য মিলনমেলা। ‘ডেডলাইন’ ট্যুরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে এই কনসার্ট যেন ভবিষ্যতের নতুন যাত্রারই ঘোষণা দিল। নতুন অ্যালবাম, নতুন গান আর বিশ্বজুড়ে অগণিত ভক্ত—সবকিছু মিলিয়ে ব্ল্যাকপিংক যে এখনো কে–পপের শীর্ষে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।