চলে গেলেন রূপালি পর্দার নায়ক জাভেদ, থেমে গেল এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৪ বার
চলে গেলেন রূপালি পর্দার নায়ক জাভেদ, থেমে গেল এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়

প্রকাশ: ২১  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল অধ্যায় আজ নিভে গেল। জনপ্রিয় চিত্রনায়ক জাভেদ আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগে বুধবার (৭ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর উত্তরায় নিজ বাসভবনে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। সকাল ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে তিনি মৃত্যুবরণ করেন বলে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও অভিনেতা জয় চৌধুরী।

জাভেদের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে চলচ্চিত্র অঙ্গনে। সহকর্মী, ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গভীর শোক প্রকাশ করছেন। একসময় যিনি রূপালি পর্দা কাঁপিয়েছেন, দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন নায়কোচিত উপস্থিতি ও নৃত্যদক্ষতায়, তাঁর চলে যাওয়ায় চলচ্চিত্রাঙ্গনে তৈরি হয়েছে এক অপূরণীয় শূন্যতা।

চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির পক্ষ থেকে জয় চৌধুরী বলেন, জাভেদ দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি বয়সজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। চিকিৎসার জন্য একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় সম্প্রতি তাঁকে বাসায় আনা হয়। পরিবারের সদস্যদের সান্নিধ্যেই তিনি শেষ সময় কাটান।

চিত্রনায়ক জাভেদের আসল নাম রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস। জন্ম ১৯৪৪ সালে, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পেশোয়ারে। দেশভাগের পর পরিবারসহ তিনি পাঞ্জাবে চলে যান। ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। বিশেষ করে নাচের প্রতি আলাদা আগ্রহ তাঁকে টেনে নেয় চলচ্চিত্র জগতের দিকে। অভিনয়ের আগে নৃত্য পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু হয়, যা পরবর্তী সময়ে তাঁকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র ‘নয়ি জিন্দেগি’র মাধ্যমে নায়ক হিসেবে রূপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে জাভেদের। সেই সময়েই তাঁর সুঠাম শরীর, সাবলীল অভিনয় আর অনন্য নাচ দর্শকের নজর কাড়ে। অভিষেক ছবিতেই প্রমাণ করেছিলেন, তিনি শুধু সৌন্দর্যের নায়ক নন, অভিনয় ও পারফরম্যান্সেও সমান দক্ষ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

ষাট ও সত্তরের দশক পেরিয়ে আশির দশক এবং নব্বইয়ের শুরুর দিক পর্যন্ত টানা কয়েক দশক ধরে তিনি ছিলেন চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক। দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন জাভেদ। রোমান্টিক, অ্যাকশন কিংবা সামাজিক—সব ধরনের চরিত্রেই তিনি ছিলেন স্বচ্ছন্দ। বিশেষ করে তাঁর নাচ ও শরীরী অভিব্যক্তি চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে জাভেদের সবচেয়ে স্মরণীয় কাজগুলোর মধ্যে ‘নিশান’ চলচ্চিত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও অনেক দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। শক্তিশালী চরিত্রায়ন ও আবেগপূর্ণ উপস্থিতির কারণে ‘নিশান’ তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়াও অসংখ্য জনপ্রিয় ছবিতে তিনি নায়ক হিসেবে দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন।

নায়ক হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দক্ষ নৃত্য পরিচালক। অনেক চলচ্চিত্রের গানের দৃশ্যের নৃত্য পরিকল্পনায় তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। নাচকে শুধু বিনোদনের উপাদান নয়, গল্প বলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন তিনি। এ কারণেই তাঁর নৃত্য পরিচালিত দৃশ্যগুলো আলাদা করে নজর কেড়েছে।

নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত চলচ্চিত্রে সক্রিয় থাকলেও পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যান জাভেদ। নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের ভিড়ে তিনি নিয়মিত পর্দায় না থাকলেও তাঁর অবদান কখনো ম্লান হয়নি। চলচ্চিত্রের মানুষজন তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতেন একজন অভিজ্ঞ শিল্পী ও নীরব অভিভাবক হিসেবে।

ব্যক্তিজীবনে জাভেদ ছিলেন অনেকটাই আড়ালপ্রিয়। ১৯৮৪ সালে তিনি চিত্রনায়িকা ডলি চৌধুরীকে বিয়ে করেন। সংসারজীবনে তিনি ছিলেন পরিবারকেন্দ্রিক। স্ত্রী ও আপনজনদের সঙ্গে সময় কাটানোই ছিল তাঁর পছন্দ। চলচ্চিত্রের ব্যস্ততা কমে যাওয়ার পর পরিবারই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান আশ্রয়।

বার্ধক্যের সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক দুর্বলতা বাড়তে থাকে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। চিকিৎসা চললেও বয়সজনিত নানা জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তবুও জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল ও শান্ত। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ দিনগুলোতেও তিনি অতীতের কাজ, সিনেমা আর সহকর্মীদের কথা স্মরণ করতেন।

চিত্রনায়ক জাভেদের মৃত্যুতে চলচ্চিত্রাঙ্গনের অনেকেই শোক প্রকাশ করেছেন। প্রবীণ ও নবীন শিল্পীরা বলছেন, তিনি ছিলেন এমন একজন নায়ক, যিনি পর্দায় যেমন শক্তিশালী ছিলেন, বাস্তব জীবনেও ছিলেন বিনয়ী ও সহানুভূতিশীল। তাঁর কাছ থেকে অনেকেই কাজ শিখেছেন, অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ইতিহাসে জাভেদ শুধু একজন নায়ক নন, তিনি একটি সময়ের প্রতিনিধিত্ব। যখন সিনেমা ছিল পরিবারকেন্দ্রিক বিনোদনের প্রধান মাধ্যম, হলভর্তি দর্শকের করতালিতে মুখরিত হতো রূপালি পর্দা—সেই সময়ের নায়ক ছিলেন তিনি। তাঁর অভিনয়, নাচ ও ব্যক্তিত্ব আজও অনেক দর্শকের মনে জীবন্ত।

জাভেদের চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সেই সময়ের আরেকজন নক্ষত্র হারাল বাংলা চলচ্চিত্র। তবে তাঁর কাজ, স্মৃতি আর অবদান রয়ে যাবে দীর্ঘদিন। নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্রপ্রেমীরা হয়তো তাঁকে সরাসরি বড় পর্দায় দেখেনি, কিন্তু পুরোনো ছবির মধ্য দিয়েই তাঁরা চিনে নেবে এক সময়ের জনপ্রিয় এই নায়ককে।

রূপালি পর্দার আলো নিভলেও জাভেদ বেঁচে থাকবেন তাঁর সিনেমায়, দর্শকের ভালোবাসায় এবং বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত