সিরিয়ায় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে রক্তাক্ত সুয়েইদা, নিহত কমপক্ষে ৩০

নিজস্ব সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ জুলাই, ২০২৫
  • ২৯ বার
সিরিয়ায় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে রক্তাক্ত সুয়েইদা, নিহত কমপক্ষে ৩০

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দক্ষিণ সিরিয়ার সুয়েইদা শহর পরিণত হয়েছে এক রক্তাক্ত সংঘর্ষের মঞ্চে। বেদুইন সুন্নি উপজাতি ও সংখ্যালঘু দ্রুজ সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ৩০ জন। তবে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর দাবি, এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। ব্রিটেনভিত্তিক যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস (SOHR) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৩৭ জনে, আহত হয়েছেন শতাধিক।

স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, সহিংস এই সংঘর্ষের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের জাতিগত ও ধর্মীয় উত্তেজনা। সংঘর্ষের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাধ্য হয়ে সরকার সেনা মোতায়েন করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সেনাবাহিনী এখন ঘটনাস্থলে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে, যাতে সহিংসতা থামানো যায় এবং আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।

দ্রুজ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতারা উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, “এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত আমাদের জাতিগত ও ধর্মীয় সংহতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।” সুয়েইদা প্রদেশের গভর্নর মুস্তাফা আল-বাকুরও আহ্বান জানিয়েছেন, জনগণ যেন উসকানিতে কান না দিয়ে আত্মসংযম বজায় রাখে এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেয়।

উল্লেখ্য, সিরিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সংঘর্ষ নতুন নয়। বাশার আল-আসাদের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে গত বছরের ডিসেম্বরে, যখন ইসলামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (HTS) দামেস্ক দখল করে নতুন নেতৃত্ব কায়েম করে। শাসন পরিবর্তনের পর থেকে দেশজুড়ে বিদ্যমান সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ বেড়েছে।

দ্রুজ সম্প্রদায়, যাদের ধর্মবিশ্বাস শিয়া ইসলামের একটি শাখাভুক্ত হলেও, তারা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয়ে গর্ববোধ করে। লেবানন, জর্দান এবং ইসরায়েলের পাশাপাশি সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলেও রয়েছে তাদের বৃহৎ উপস্থিতি। আসাদ সরকারের আমলে তারা সাধারণত সরকারি পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল, কারণ তারা মনে করতো সরকারই তাদের অস্তিত্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। তবে গৃহযুদ্ধ ও ক্ষমতা পরিবর্তনের পর সেই সমীকরণে এসেছে বড় পরিবর্তন। এখন তাদের জন্য নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার বিষয়টি হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি নতুন বাস্তবতা।

সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কয়েকজন দ্রুজ নাগরিক জানান, তারা কেবল সংঘর্ষ বা সহিংসতার শিকার হবেন এই ভয়েই নয়, বরং নতুন সরকারের অভিপ্রায় ও সামর্থ্য নিয়েও সন্দিহান। তারা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান সরকার হয়তো সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় আগের সরকারের মতো আন্তরিক হবে না।

এই সহিংসতার মধ্যে অন্য সংখ্যালঘুদের অবস্থাও শঙ্কাজনক। আলাউই সম্প্রদায়, যারা দীর্ঘদিন ধরে আসাদ সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, তাদেরও বিভিন্ন স্থানে হামলার শিকার হতে দেখা গেছে। এমনকি রাজধানী দামেস্কে একটি খ্রিস্টান চার্চে হামলার ঘটনায় বহু প্রার্থনাকারী প্রাণ হারিয়েছেন।

তবে এসব সহিংসতা ও অস্থিরতার মধ্যেই পশ্চিমা বিশ্বের কিছু দেশ সিরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি হায়াত তাহরির আল-শাম (HTS)–কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকা থেকে সরিয়ে নিয়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চলছে নানা বিতর্ক। একইসঙ্গে, ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি সিরিয়া সফর করেছেন, যা গৃহযুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবার কোনো ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সফর।

এই সাম্প্রতিক সংঘর্ষ সিরিয়ায় বর্তমান সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা না গেলে, দেশটি আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হতে পারে—এমন আশঙ্কা ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠছে। দেশটির ভবিষ্যৎ যে এখনও অনিশ্চয়তার ঘোর আঁধারে ঢাকা, তা আবারও প্রমাণ করল সুয়েইদার এই রক্তাক্ত দিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত