বাংলাদেশের পণ্যে শুল্ক কমাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র: আশার বার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫১ বার
বাংলাদেশের পণ্যে শুল্ক কমাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র: আশার বার্তা

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের স্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক আরও কমানোর ঘোষণা দিতে পারে। চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে অথবা আগামী সপ্তাহের শুরুতেই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এই বার্তাটি তিনি পেয়েছেন সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্য স্কট বেসেন্টের সঙ্গে বৈঠক থেকে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বেইলি রোডে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ডব্লিউইএফ সম্মেলনে অংশগ্রহণ নিয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন লুৎফে সিদ্দিকী। ব্রিফিংয়ে তিনি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক প্রসঙ্গই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্ভাব্য মুক্তবাণিজ্য চুক্তি, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেন।

মার্কিন পাল্টা শুল্ক প্রসঙ্গে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, ওয়াশিংটন বাংলাদেশের ওপর থেকে শুল্ক কমানোর বিষয়ে আন্তরিকতা দেখাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, বর্তমানে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যে ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কার্যকর রয়েছে, তা আরও কমানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। তবে এই হার কতটা কমবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা জানানো হয়নি। তিনি বলেন, বিষয়টি পারস্পরিক আলোচনার ওপর নির্ভর করছে এবং খুব শিগগিরই এ নিয়ে একটি ঘোষণা আসতে পারে।

লুৎফে সিদ্দিকী স্মরণ করিয়ে দেন, শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশের বেশি পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল। পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে সেটি কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এই অগ্রগতি দেখেই আশা করা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে শুল্ক আরও কমানো হতে পারে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার এজেন্ডার মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে, যা এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।

শুল্ক কমানোর পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। আগে যেখানে এই ঘাটতি ছিল প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার, এখন তা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি ইতিবাচক দিক। পাশাপাশি শ্রম সংস্কার, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং বাণিজ্য স্বচ্ছতা বৃদ্ধির মতো বিষয়ে বাংলাদেশের চলমান সংস্কার উদ্যোগও ওয়াশিংটনের কাছে ইতিবাচকভাবে বিবেচিত হচ্ছে।

পটভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। সেই তালিকায় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়েছিল, যা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ৯ এপ্রিল। তবে কার্যকরের দিনই তিন মাসের জন্য দেশভিত্তিক বাড়তি শুল্ক আরোপ স্থগিত করা হয়। পরে তিন মাসের বিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গত ৯ জুলাই বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের জন্য নতুন শুল্কহার পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তখন বাংলাদেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক ৩৫ শতাংশে নামানো হয় এবং ১ আগস্ট থেকে তা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।

এরপর সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার ফল হিসেবে ১ আগস্ট থেকেই বাংলাদেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরও কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর সব মিলিয়ে চূড়ান্ত শুল্ক তখনও ৩৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এই উচ্চ শুল্কের প্রভাব খুব দ্রুতই রপ্তানি খাতে নেতিবাচকভাবে পড়ে। রপ্তানি আদেশ হঠাৎ কমে যায়, অনেক ক্রেতা অর্ডার বাতিল বা স্থগিত করে। এর ফলে রাতারাতি রপ্তানি আয় কমতে শুরু করে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে।

এ পরিস্থিতিতে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রতিযোগী দেশগুলোর আচরণ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বেশি শুল্কের কারণে চীন ও ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে আরও আগ্রাসী বাণিজ্য কৌশল গ্রহণ করে। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপরও। বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ে।

ডব্লিউইএফ সম্মেলনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয় বলে জানান লুৎফে সিদ্দিকী। তিনি বলেন, সম্ভাব্য মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ইইউ কমিশনার রোক্সানা মিনজাতু ও জোজেফ সিকেলার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইইউর সঙ্গে একটি এফটিএ করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইইউ পক্ষ থেকেও আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে, তবে তাদের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ধীরগতির।

তিনি উল্লেখ করেন, ইইউ বর্তমানে ভারতের সঙ্গে একটি এফটিএ চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে এবং ভিয়েতনাম ইতিমধ্যেই ইইউর সঙ্গে এফটিএ করেছে। এতে বাংলাদেশের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। বরং ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি এবং জানান, এই বিষয়ে পরবর্তী সরকারের জন্য বিস্তারিত নোট রেখে যাবেন।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, ভবিষ্যৎ বাণিজ্য নীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। ডব্লিউটিওপ্রধান বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে কেবল বহুপক্ষীয় বাণিজ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। জাপানের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের জন্য বড় সাফল্য হতে পারে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক হ্রাসের ঘোষণা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে। রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও লাখো শ্রমিকের জন্য স্বস্তি ফিরতে পারে। এখন অপেক্ষা শুধু ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার, যা বাংলাদেশের বাণিজ্য ভবিষ্যতের গতিপথে নতুন মোড় আনতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত