প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও প্রাণের সঞ্চার ঘটছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে। প্রায় ৪৭ দিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে একটি প্রমোদতরী, যা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহণ খাতে এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। মাল্টার পতাকাবাহী ‘সেলেস্টিয়াল ডিসকভারি’ নামের এই জাহাজটির যাত্রা শুধু একটি নিয়মিত ট্রানজিট নয়, বরং এটি বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে আংশিক স্বাভাবিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মেরিন ট্রাফিক-এর তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি মার্চের শুরুতে দুবাই বন্দরে পৌঁছায় এবং টানা প্রায় দেড় মাস সেখানে নোঙর করে ছিল। এই দীর্ঘ সময় জাহাজটির অবস্থান স্থির থাকা থেকেই বোঝা যায়, অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা অনিশ্চিত ছিল। অবশেষে পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে আসায় শুক্রবার এটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে এবং বর্তমানে মাস্কাট-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে দিনের শেষ নাগাদ পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
তবে এই যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, জাহাজটি সম্পূর্ণ যাত্রীবিহীন অবস্থায় চলাচল করেছে। সাধারণত প্রমোদতরী বা ক্রুজ লাইনারগুলো পর্যটকবাহী হয়, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ‘সেলেস্টিয়াল ডিসকভারি’ কেবলমাত্র ক্রু সদস্যদের নিয়েই যাত্রা শুরু করে। নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়ানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ট্রানজিট একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকা এই নৌপথ দিয়ে একটি জাহাজের সফল যাত্রা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌপরিবহণ খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। যদিও এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি, তবুও এটি একটি ইতিবাচক সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য যে, সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে এবং এক পর্যায়ে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রণালিটি পারস্য উপসাগরকে আন্তর্জাতিক জলসীমার সঙ্গে যুক্ত করে এবং বিশ্বের তেল পরিবহণের একটি বড় অংশ এখান দিয়ে সম্পন্ন হয়। ফলে এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও সরাসরি পড়ে।
সংঘাতের সময় ইরান কেবল নৌপথ নিয়ন্ত্রণই করেনি, বরং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও আঘাত হানার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়ে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
সম্প্রতি শর্তসাপেক্ষে হরমুজ প্রণালি আবারও উন্মুক্ত ঘোষণা করে ইরান। তবে এই উন্মুক্ততা পুরোপুরি নিঃশর্ত নয়। ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করেই এই নৌপথের ব্যবহার অব্যাহত থাকবে। ফলে এখনো একটি অনিশ্চয়তার আবহ বিরাজ করছে।
বিশ্বব্যাপী নৌপরিবহণের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলএনজি এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩৮টি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করত। কিন্তু সংঘাতের কারণে সেই সংখ্যা হঠাৎ করেই কমে যায় এবং বহু জাহাজ উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকা পড়ে।
লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩২৫টি ট্যাঙ্কারসহ ৬০০টির বেশি জাহাজ এখনো এই অঞ্চলে অপেক্ষমাণ রয়েছে। এসব জাহাজের মধ্যে অনেকগুলোই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বহন করছে, যা বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে ‘সেলেস্টিয়াল ডিসকভারি’-এর সফল যাত্রা অন্যান্য জাহাজের জন্যও একটি পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, একটি বা দুটি জাহাজের চলাচল দিয়ে পুরো পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বলা যাবে না। এখনো নিরাপত্তা ঝুঁকি বিদ্যমান এবং রাজনৈতিক উত্তেজনাও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। তাই আগামী দিনগুলোতে আরও জাহাজ যদি নিরাপদে এই পথ অতিক্রম করতে পারে, তাহলেই প্রকৃত অর্থে স্বস্তি ফিরবে।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি প্রতিফলন। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতায় উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চলছে, যার ফলে আংশিকভাবে হলেও পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে এই শান্তিপূর্ণ অবস্থান কতদিন স্থায়ী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ৪৭ দিন পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে একটি প্রমোদতরীর সফল যাত্রা বিশ্ব অর্থনীতি ও নৌপরিবহণ খাতে আশার আলো দেখিয়েছে। এটি যেমন একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে, তেমনি একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এখনো ভঙ্গুর। তাই ভবিষ্যতে এই নৌপথে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন হবে ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।